বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ

 বিভ্রান্ত তরুণদের সুপথে ফেরাতে হবে

ড.বদিউল আলম মজুমদার

২০ আগস্ট প্রথম আলোর মতামত পাতায় সোহরাব হাসান তাঁর ‘হারিয়ে যাওয়া তরুণ, হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ’ শীর্ষক উপসম্পাদকীয়তে বিবিসি বাংলার একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশের তরুণদের উগ্রবাদের সঙ্গে জড়িত হওয়ার চারটি কারণ চিহ্নিত করেছেন: ১. সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ও ইন্টারনেটের প্রতি তরুণদের ঝুঁকে পড়া; ২. তরুণদের মধ্যে নিঃসঙ্গতা ও হতাশা; ৩. ধর্মের প্রতি তরুণদের আকর্ষণ এবং ৪. শিক্ষার্থীদের সামনে কোনো আদর্শ ব্যক্তিত্ব না থাকা।
ব্যক্তিগতভাবে সারা দেশে আমি লাখ খানেক তরুণের—ছেলে ও মেয়ে উভয়ের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করি। তাদের সঙ্গে অনেক দিন ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বিবিসির সাক্ষাৎকারে চিহ্নিত কারণগুলো সঠিক, তবে এর সঙ্গে আরও দু-একটি কারণ যুক্ত করা দরকার। যুক্ত করা দরকার আরও কিছু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ।
প্রথমত, জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত তরুণেরা চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও বিভ্রান্ত। তারা ক্ষুব্ধ দুই কারণে—আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এসব তরুণ বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের—তাদের দৃষ্টিতে ‘দুরবস্থা’ দেখে ক্ষুব্ধ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে মিয়ানমার পর্যন্ত মুসলমানদের প্রতি ‘নিগ্রহ’ তাদের ক্ষোভের বড় কারণ। ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেখা শিশু আয়লান ও ওমরানের ছবি তাদের ক্ষোভ আরও চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়।
দেশের ভেতরেও অনেক কারণ রয়েছে তাদের ক্ষুব্ধ হওয়ার। বহুদিন থেকে অব্যাহত ও ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন ও অপশাসন তাদের ক্ষুব্ধ করে। তারা নিজেরা, নিজেদের পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনেরা অনেক ক্ষেত্রে এসব অপশাসন ও হয়রানির শিকার হয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে তাদের মুখ বুজে এসব বঞ্চনা এবং ক্ষমতাসীনদের অনেক অপকর্ম ও বাড়াবাড়ি সইতে হয়েছে। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিদের অসৎ উপায়ে অর্জিত সম্পদের অশ্লীল প্রদর্শনীও তাদের ক্ষুব্ধ করে। বঞ্চনা, বৈষম্য ও অসহায়ত্ব সাধারণত মানুষকে ধর্মাশ্রয়ী করে তোলে এবং দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশের মানুষের মধ্যেও তা-ই ঘটেছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ও দেশের অভ্যন্তরে বিরাজমান অন্যায় ও অসংগতির একমাত্র সমাধান হিসেবে তাদের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’। তাদের বোঝানো হচ্ছে যে শরিয়া আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এক ভিন্ন ধরনের শাসনব্যবস্থাই এর থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ। তবে কারা এসব প্রচারণার শিকার হয়ে জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকবে, তা মূলত নির্ভর করে তাদের মানসিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিগত অবস্থার ওপর।
দ্বিতীয়ত, জঙ্গিবাদের প্রতি আকৃষ্ট তরুণেরা শুধু ক্ষুব্ধই নয়, তারা অনেকটা অনুপ্রাণিতও। আইএসের মাধ্যমে তারা দেখছে মুসলিম উম্মাহর সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগ। তাদের বোঝানো হচ্ছে যে মুসলিম উম্মাহর সংঘবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমেই খেলাফত কায়েম করে তারা সারা পৃথিবীতে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। কল্পনাবিলাসী অনেক তরুণ এসব আকাশকুসুম কল্পনা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিপথগামী হয় এবং সহিংস জিহাদ তথা জঙ্গিবাদকে তাদের ‘ইমানি দায়িত্ব’ হিসেবে গ্রহণ করে।
আমাদের আশঙ্কা, আমাদের তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উগ্রবাদের প্রচারণার শিকার হয়েছে। তাদের অনেকেই জঙ্গিবাদের পথে না হাঁটলেও উগ্রবাদী চিন্তাচেতনা দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছে। তাদের কারও কারও মধ্যে উগ্রবাদী চিন্তার প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি একজন বড় রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে আমি শুনেছি, একটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ থেকে পাস করা তাঁর সন্তানের অনেক সতীর্থই বাংলা নববর্ষ পালনকে অনৈসলামিক মনে করে। এমন পরিস্থিতি আমাদের উদ্বেগের কারণ না হয়ে পারে না।
তাই উগ্রবাদের প্রভাব থেকে আমাদের তরুণদের রক্ষা করা আজ জরুরি হয়ে পড়েছে। জরুরি হয়ে পড়েছে তাদের বিভ্রান্তি ভেঙে ফেলা। আর এ জন্য প্রয়োজন হবে একটি সুচিন্তিত কৌশল। তরুণদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা, তাদের কথা শোনা এবং তাদের সঙ্গে তর্ক করা যার অংশ হতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত, জঙ্গিবাদ প্রতিহত করার আমাদের বিরাজমান কৌশল হলো মূলত বলপ্রয়োগ করা। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত বা যুক্ত হতে প্রস্তুত এবং তাদের মদদদাতাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই বলপ্রয়োগ করতে হবে। তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং কঠোর শাস্তি দিতে হবে। তবে যারা নিতান্তই বিভ্রান্ত, তাদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করলে হিতে বিপরীতই হতে পারে। তাদের সঙ্গে বরং মতবিনিময় করতে হবে।
তরুণদের সঙ্গে উগ্রবাদ নিয়ে কার্যকরভাবে মতবিনিময় করতে হলে উগ্রবাদীদের ব্যবহৃত প্রচারণা ও ব্যাখ্যার সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। পরিচিত হতে হবে তাদের ব্যবহৃত যুক্তির সঙ্গে। আর এর ভিত্তিতেই তৈরি করতে হবে একটি বিকল্প ও সুচিন্তিত ব্যাখ্যা, যে ব্যাখ্যার ভিত্তিতে বিভ্রান্ত তরুণদের যুক্তি আরও ক্ষুরধার যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করা যাবে। ইসলাম যে জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে না এবং জিহাদের অর্থ যে মানুষ হত্যা নয়, তা সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। ব্যাখ্যা করতে হবে যে জঙ্গিবাদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুসলমানদের প্রতি বিরাজমান নিগ্রহের অবসান তো হবেই না; বরং তার আরও অবনতি ঘটবে। এর মাধ্যমে তারা স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’-এর ভবিষ্যদ্বাণীকেই সত্যে পরিণত করবে। এ ছাড়া বাস্তবে সারা পৃথিবীতে মুসলমানেরাই মুসলমানদের হাতে বেশি নির্যাতিত। উপরন্তু, বহু ভিন্নধর্মাবলম্বী মানুষ মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও বঞ্চনার ব্যাপারে অত্যন্ত সোচ্চার—এমনকি মুসলমানদের রক্ষার জন্য তারা (যেমন বসনিয়ায়) যুদ্ধেও লিপ্ত হয়েছে। সারা বিশ্বে মুসলমানদের অবস্থার উন্নতির জন্য এদের সহায়তা লাগবে এবং আরও অনেককে সোচ্চার করতে হবে। আর মুসলমানদের অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে তাদের নিজেদেরই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। যেমন, যত দিন মুসলমানরা জ্ঞানে-বিজ্ঞানে অগ্রগামী ছিল, তত দিন তারা সারা পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তার করেছে।
অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তরুণদের ক্ষোভ দূর করার ব্যাপারেও আমাদের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ করণীয় রয়েছে। এ লক্ষ্যে সমাজে বিরাজমান অন্যায়-অবিচার, হয়রানি, অধিকারহীনতা, দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন তথা অপশাসনের অবসান ঘটাতে হবে। অর্থনৈতিক ও সুযোগের বৈষম্যের অবসান করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে আইনের শাসন। সরকারকে আরও উপলব্ধি করতে হবে যে তরুণেরা আমাদের সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের’ উৎস। আর এই ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগাতে হলে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে তরুণদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ না হলেও হতাশাগ্রস্ত তরুণেরা ভবিষ্যতে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারে।
আমরা ‘ইয়ুথ এন্ডিং হাঙ্গার’-এর উদ্যোগে তরুণদের নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করছি, যা তাদের উগ্রবাদের দুষ্ট ছোবল থেকে মুক্ত রাখছে। আমরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের মধ্যে দেশপ্রেম ও ইতিবাচক মানসিকতা সৃষ্টি এবং তাদের ইতিবাচক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করছি। তাদের নিজেদের সর্বোচ্চ বিকাশের জন্য প্রণোদনা জোগাচ্ছি। তাদের মধ্যে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার মানসিকতা সৃষ্টি করছি, যার ভিত্তিতে তারা বিভিন্ন ধরনের সমাজ উন্নয়নমূলক কাজে জড়িত হচ্ছে। তারা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বাল্যবিবাহ, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, মাদকাসক্তি রোধ এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা সৃষ্টি ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিজ নিজ এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। অনেকে পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে কোচিংয়ের ব্যবস্থা করছে। কেউ কেউ আত্মকর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিচ্ছে। নিজেদের এবং অন্য তরুণদের বিকাশের জন্য তারা গণিত অলিম্পিয়াড, বিতর্ক, পাঠচক্র, খেলাধুলা ইত্যাদির আয়োজন করছে। নিজেদের বিকাশের এবং সমাজের জন্য গৃহীত এসব কার্যক্রম নিঃসন্দেহে তাদের জীবনকে অর্থবহ করে তোলে, যা উগ্রবাদের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
পরিশেষে, তরুণেরা আমাদের দেশের জন্য বড় সম্পদ। তাদের সর্বোচ্চ বিকাশ হলে, তাদের মধ্যে ইতিবাচক মানসিকতা সৃষ্টি হলে, তাদের ইতিবাচক কাজের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে, তাদের ধর্মীয় উগ্রবাদ থেকে দূরে রাখা গেলে, সর্বোপরি তাদের সঠিক পথে রাখা গেলে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ স্বর্গরাজ্যে পরিণত হতে পারে। আর আমাদের তরুণেরা বিপথগামী হলে বাংলাদেশ ভবিষ্যৎ নরকে পরিণত হতে পারে। তাই জাতি হিসেবে আমরা যেন আজ এক বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছি।
বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।

(২৯ আগষ্ট ২০১৬, প্রথম আলোতে প্রকাশিত)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s