এসডিজি ও বাংলাদেশের তারুণ্য

index২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৯৩টি দেশের রাষ্ট্র/সরকার প্রধানেরা ‘ট্রান্সফরমিং আওয়ার ওয়ার্ল্ড: দ্যা ২০৩০ এজেন্ডা ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ শিরোনামের একটি কর্মসূচি অনুমোদন করে, যা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (এসডিজি) নামে পরিচিত। বিশ্বমানবতার সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে এটি একটি কর্মপরিকল্পনা, যা বিশ্বব্যাপী শান্তি, স্বাধীনতা ও কার্যকর অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত করবে। বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রত্যাশা, ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাবে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এবং অর্জিত হবে পরিবেশের ভারসাম্য।

এসডিজি: বিশ্ব রূপান্তরের নতুন এজেন্ডা
এসডিজিতে বিস্তারিত, সুদূরপ্রসারী ও গণকেন্দ্রিক, বিশ্বজনীন রূপান্তর সৃষ্টিকারী ১৭টি লক্ষ্য এবং ১৬৯টি টার্গেট অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। লক্ষ্যগুলো হলো: (১) সব ধরনের দারিদ্র্য দূর করা; (২) ক্ষুধা দূর করা; (৩) সবার জন্য স্বাস্থ্যকর জীবন ও কল্যাণ নিশ্চিত করা; (৪) সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা; (৫) নারীদের সম-অধিকার এবং তাদের ও কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা; (৬) সবার জন্য টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ও পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা; (৭) সবার জন্য সুলভ, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি নিশ্চিত করা; (৮) সবার জন্য স্থায়ী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক কার্যক্রম উৎসাহিত, পরিপূর্ণ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং উপযুক্ত কর্মের নিশ্চয়তা প্রদান করা; (৯) স্থিতিশীল অবকাঠামো তৈরি, অন্তভুর্ক্তিমূলক এবং টেকসই শিল্পায়ন ও উদ্ভাবন উৎসাহিত করা; (১০) অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বৈষম্য কমিয়ে আনা; (১১) নগর ও মানব বসতিগুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, স্থিতিশীল ও টেকসই করা; (১২) টেকসই উৎপাদন ও ভোগ নিশ্চিত করা; (১৩) জলবায়ু পরিবর্তন এবং তার বিরুপ প্রভাবের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা; (১৪) পরিবেশ উন্নয়নে সাগর, মহাসাগর ও সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা; (১৫) স্থলজ বাস্তুতন্ত্রের সংরক্ষণ, পুনরুজ্জীবন ও টেকসই ব্যবহার উৎসাহিত, বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবহার, মরুকরণ প্রতিহত এবং ভূমির মানে অবনতি রোধ ও জীববৈচিত্র্যের রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা; (১৬) টেকসই উন্নয়নে শান্তিপূর্ণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ তৈরি, সবার জন্য ন্যায়বিচারের সুযোগ এবং সর্বস্তরে কার্যকর, দায়বদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা; (১৭) টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য বাস্তবায়নের পদ্ধতিগুলো শক্তিশালী এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব জোরদার করা।

এসডিজি ব্যাপক কনসালটেশন বা আলোচনার ভিত্তিতে গৃহীত হয়েছে, যদিও সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) প্রণয়ন করেছিলেন একদল বিশেষজ্ঞ।  জাতিসংঘের ইতিহাসের সর্বাধিক অংশগ্রহণমূলক উদ্যোগ, যাতে বহুদেশের অসংখ্য নাগরিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং সদস্য রাষ্ট্রসমূহ অংশ নিয়েছে।  তাই এটি বাইরে থেকে আরোপিত নয়, বরং জনগণের মালিকানায় প্রণীত এজেন্ডা।  বস্তুত এটিকে বলা হয় ‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য ও জনগণের এজেন্ডা’ এবং এর বাস্তবায়নও নির্ভর করবে স্থানীয় পর্যায়ে মূলত জনগণের নেতৃত্ব ও উদ্যোগের ওপর।

যদিও এসডিজি এমডিজি’র অভিজ্ঞতার আলোকে প্রণীত হয়েছে, কিন্তু এটির গুরুত্ব হলো যে, এটির পরিধি এমডিজি থেকে অনেক বিস্তৃত এবং এমডিজি’র সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা এর লক্ষ্য।  দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টিসহ উন্নয়নের গতানুগতিক কর্মসূচির বাইরে এতে আরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিভিন্ন লক্ষ্য।  এসডিজি’র লক্ষ্য ও টার্গেটগুলোর গভীর আন্তঃসংযোগ ও পারস্পরিক যোগসূত্র নতুন এজেন্ডায় সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত।

এসডিজি’র বৈশিষ্ট্য:

  •     ইউনিভার্সাল বা সার্বজনীন লক্ষ্য: এমডিজি’র প্রেক্ষাপট ছিল ধনী দাতাদের দান আর দরিদ্র গ্রহীতাদের গ্রহণ।  পৃথিবী এখন নাটকীয়ভাবে বদলে যাচ্ছে। দেশে দেশে সরকারি উন্নয়ন সহায়তা অন্যান্য সম্পদ প্রবাহের তুলনায় এখন অতি ক্ষুদ্র।  অধিকাংশ দরিদ্রতম মানুষ বসবাস করে মধ্যম আয়ের দেশে।  অসমতা (Inequality) একটি সমস্যা, যা ধনী এবং দরিদ্র উভয় দেশের সমস্যা। এসডিজি’র লক্ষ্যগুলো হবে ধনী-দরিদ্র প্রত্যেক দেশের জন্য প্রযোজ্য।
  •     শূন্যভিত্তিক লক্ষ্য: ২০১৫ সালের মধ্যে এমডিজি অর্জনের লক্ষ্য ছিল পৃথিবী থেকে ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূর করার অর্ধেক পথ অতিক্রম করা।  এসডিজি নির্ধারণ করা হয়েছে কাজটি পুরোপুরি সম্পন্ন করার জন্য।  ক্ষুধা, দারিদ্র্য, শিশুমৃত্যু ও অন্যান্য লক্ষ্যমাত্রায় পুরোপুরি অর্জন তথা পরিসংখ্যানগতভাবে ‘শূন্য’ভিত্তিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে।  শূন্যভিত্তিক লক্ষ্য অর্জনে অতি দরিদ্রদের কাছে পৌঁছাতে হবে এবং তাদেরকে ক্ষমতায়িত করতে হবে।
  •     অংশগ্রহণমূলকভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ: এমডিজি প্রণয়ন করা হয়েছিল ‘টপ ডাউন’ পদ্ধতিতে।  এসডিজি করা হয়েছে ব্যাপকভাবে সমন্বিত অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে।  ১০০টিরও বেশি দেশে মুখোমুখি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে। ১০ লাখেরও বেশি মানুষ এসডিজি নিয়ে ওয়েবসাইটে তাদের মতামত দিয়েছে।  সিভিল সোসাইটি সংঘবদ্ধভাবে আলোচনায় অংশ নিয়েছে এবং তাঁদের মতামত দিয়েছে।
  •     শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক সম্প্রীতি তৈরি: বিগত ১৫ বছরে দেখা গেছে, যে সকল দেশে শান্তি বিরাজমান এবং সুশাসন ছিল সে সকল দেশ উন্নতি সাধন করেছে। সুশাসনের বিষয়টি এমডিজিতে উপেক্ষিত ছিল। তাই সামনের দিনগুলোতে এসডিজিতে এর ১৬তম লক্ষ্যকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, যে লক্ষ্যে টেকসই উন্নয়নে শান্তিপূর্ণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণের কথা বলা হয়েছে। সবার জন্য ন্যায়বিচারের সুযোগ সৃষ্টির তাগিদ দেয়া হয়েছে। সর্বস্তরে কার্যকর, দায়বদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে।
  •     গুণগত শিক্ষা: এমডিজি শিক্ষার মান বিচারের জন্য সংখ্যাতত্ত্বের ওপর নির্ভর করেছে, যেমন, উচ্চ তালিকাভুক্তির হার। কিন্তু এসডিজিতে মানবীয় বিশ্ব গড়তে গুণগত শিক্ষার অর্জনের কথা বলা হয়েছে, যে শিক্ষা হবে স্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যে। যে শিক্ষার ফলাফল হিসেবে নিশ্চিত হবে মানবাধিকার, জেন্ডার সমতা, শান্তিপূর্ণ সংস্কৃতি, বৈশ্বিক নাগরিকত্ববোধ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও টেকসই উন্নয়নের সংস্কৃতি।
  •     পরিবীক্ষণ: এমডিজি পর্যবেক্ষণ, পরিবীক্ষণ এবং জবাবদিহিতা সম্পর্কে কিছুই বলছে না। কিন্তু এসডিজিতে সর্বস্তরে পরিবীক্ষনের কথা বলা হয়েছে। উচ্চ মানসম্পন্ন এবং নির্ভরযোগ্য ডাটা যথাসময়ে সংগ্রহ এবং সরবরাহ করার কথা বলা হয়েছে। ডাটাসমূহ হবে আয়, জেন্ডার, বয়স, বর্ণ, গোত্র, অভিবাসন, অক্ষমতা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং জাতীয় প্রেক্ষাপটের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যভিত্তিক।

অর্থায়ন: এমডিজি’র অর্থায়ন মূলত ছিল সাহায্য নির্ভর। অন্যদিকে স্থায়ী এবং সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনাকে এসডিজি মূল কৌশল হিসেবে নিয়েছে। দেশগুলো তাদের সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় নিজেদের প্রচেষ্টায় অর্থসংস্থান সক্ষমতা বাড়াবে, যা এসডিজি’র অন্যতম কৌশল।

এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশের উদাহরণ সৃষ্টি
এমডিজি বাস্তবায়ন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে (২০১৫) বলা হয়েছে যে, দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ সাফল্য দেখিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের তিন বছর আগেই এ লক্ষ্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ২৯ শতাংশের বিপরীতে এমডিজি’র মেয়াদের শেষ বছর ২০১৫ সালে এসে দেশের দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২৪.৮ শতাংশে। তবে এখনো ৩ কোটি ৯২ লাখ মানুষ উচ্চ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। আর এদের মধ্যে নিম্ন দারিদ্র্যরেখার নিচে বসবাস করে ২ কোটি ৪ লাখ মানুষ।

দারিদ্র্য বিমোচনে এখনো বাংলাদেশের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ চ্যালেঞ্জগুলো হলো প্রত্যন্ত ও চরাঞ্চলে বিদ্যমান দারিদ্র্য পকেট; আয় বৈষম্য এবং নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তুলনামূলক কম অংশগ্রহণ। শিশুমৃত্যুর হার, মাতৃমৃত্যুর হার, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অর্জন বেশ ভালো। মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য এমডিজিতে যে লক্ষ্য রয়েছে তাতেও বাংলাদেশ সফল হয়েছে। সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশ যথেষ্ট উন্নতি করেছে। ভালো করেছে লিঙ্গসমতা ও নারীর ক্ষমতায়নে। বেড়েছে প্রাথমিক ও মাধ্যশিক শিক্ষা পর্যায়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ।

ধারাবাহিকভাবে গত কয়েক বছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশি হওয়ায় তা দারিদ্র্য বিমোচনে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। এমডিজিতে বার্ষিক দারিদ্র্য বিমোচনের হার ১.২০% মানে রাখার লক্ষ্য ছিল। বাংলাদেশে ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বছরে গড়ে ১.৭৪% মানে দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তিনটি ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। ক্ষেত্র তিনটি হলো কর্মসংস্থান, পুষ্টি এবং পরিবেশ। এমডিজিতে তরুণদের শতভাগ বেকারতœ নিরসনের লক্ষ্য থাকলেও ১৫-২৪ বছর বয়সী তরুণ প্রজন্মের ৫৭.১% এখনও বেকার। ১৯৯০-৯১ সালে বেকারত্বের এই হার ছিল ৪৮.৫%। টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৩.৪০ শতাংশ বনভূমি বা বৃক্ষরাজিতে ভরপুর। ২০১৫ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ বনভূমি বা বৃক্ষরাজিতে পরিপূর্ণ থাকার লক্ষ্য ছিল।

এসডিজি অর্জনের জন্য প্রয়োজন 
বৈশ্বিক উন্নয়ন কর্মসূচিকে জাতীয় পরিকল্পনার সাথে সমন্বয় করা, সকলের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা, সম্পদের প্রাপ্যতা, বস্তুনিষ্ঠ পরিসংখ্যান ও তদারকি এবং কাঠামোগত কৌশল ও বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ থাকলেও বাংলাদেশ এমডিজি’র মতো এসডিজিতে সাফল্য অর্জন করবে, দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করবে এ প্রত্যাশা সকলের। তবে,

  •     সরকারকে আন্তরিক এবং প্রতিশ্র“তিবদ্ধ হতে হবে, বিশেষত এসডিজি’র ১৬তম লক্ষ্য বাস্তবায়নে। এজন্য সমাজের সকল  স্তরে স্বচ্ছ, কার্যকর এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া হবে জনঅংশগ্রহণমূলক তথা সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে;
  •     নীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন এনে প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ তথা ইউনিয়ন পরিষদকে যথাযথ দায়-দায়িত্ব, সম্পদ ও ক্ষমতা প্রদান করতে হবে;
  •     ইউনিয়ন পরিষদ যাতে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯ অনুযায়ী, জনঅংশগ্রহণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে এবং শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে সে জন্য পরিষদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন;
  •     অর্র্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনে একটি সমন্বিত কর্মসূচি প্রয়োজন;
  •     অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি খাতের যথাযথ ভূমিকা পালন প্রয়োজন। জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যথাযথ এবং সময়োপযোগী সহযোগিতা প্রয়োজন;
  •     সকল স্তরে পরিবীক্ষণ (মনিটরিং) প্রয়োজন, যা শুরু হবে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে।

এসডিজি অর্জন: নেতৃত্ব দিতে হবে তরুণ প্রজন্মকেই 
এসডিজি ৪, ৫ এবং ৮ এ স্পষ্টভাবে তরুণদের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এসডিজি (৪): সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা; এসডিজি (৫): নারীদের সম-অধিকার এবং তাদের ও কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা; এসডিজি (৮): সবার জন্য স্থায়ী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক কার্যক্রম উৎসাহিত, পরিপূর্ণ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং উপযুক্ত কর্মের নিশ্চয়তা প্রদান করা।

এসডিজি প্রণীত হয়েছে জাতিসংঘের উদ্যোগে। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এতে স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু শুধুমাত্র জাতীয় উদ্যোগ বা সরকারি নির্দেশেই এসডিজি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। এর বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে বৈশ্বিক, জাতীয় ও স্থানীয় উদ্যোগ। বিশেষ করে এর স্থানীয়করণ করে তথা স্থানীয় জনসাধারণকে উজ্জীবিত, অনুপ্রাণিত ও সম্পৃক্ত করে ‘কমিউনিটি-লেড ডেভেলপমেন্ট’ এপ্রোচ এর মাধ্যমে এসডিজি অর্জন করতে হবে। জনগণ, জনপ্রতিনিধি এবং জনপ্রশাসনের একটি কার্যকর অংশীদারিত্ব একটি অন্যতম শর্ত। এ অংশীদারিত্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে আমাদের তরুণ প্রজন্ম। স্থানীয় উন্নয়নে স্বেচ্ছাব্রতী মানসিকতা সৃষ্টি করে তরুণদের সম্পৃক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। এদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে গঠনমূলক কাজে নিয়মিত অংশগ্রহণের জন্য উজ্জীবিত করা গেলে সারাদেশে একটি বিরাট কর্মযজ্ঞ সৃষ্টি হতে পারে। আর এ ধরনের কর্মযজ্ঞ বাংলাদেশের জন্য একটি অমিত সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে ১৮৫টি ইউনিয়নে কাজ করে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট এই অভিজ্ঞতাই অর্জন করেছে।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এর বার্ষিক প্রতিবেদন (২০১৪) অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীর সংখ্যা ৪ কোটি ৭৬ লাখ। তারা মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশের মতো। দেশে ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার অর্ধেক। এ বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠী আমাদের জন্য বিশাল সম্পদ, যাকে আমরা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলতে পারি। এ সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে, তাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে এবং তারা যাতে ইতিবাচক কাজে নিয়োজিত হতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।

আশার দিক হলো- আমাদের তরুণেরা বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে এবং তারা সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে উৎসুক। জীবনকে তারা অর্থবহ করতে চায়। সমাজকে এগিয়ে নিতে চায়। সম্প্রতি ব্রিটিশ কাউন্সিল পরিচালিত ‘Next Generation Bangladesh 2015 and Beyond’ জরিপে দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশ তরুণ-তরুণী আশাবাদী যে, আগামী ১৫ বছর পর বাংলাদেশের সমৃদ্ধি আরও বাড়বে। তাই তাদের ক্ষমতায়িত করা গেলে জাতি হিসেবে সম্ভাবনার পথে আমরা এগিয়ে যেতে পারবো। তারা স্বপ্ন দেখে সুন্দর এক ভবিষ্যতের, তাদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করতে এবং নিজেদের প্রতিষ্ঠায় তারা সংগ্রাম করে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে। তরুণরা বিশ্বাস করে- ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য নির্মূলে তারাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তারুণ্য মানে জীবনের প্রস্ফুটিত ফুল, যখন শরীর ও মনের শক্তি থাকে সর্বোচ্চ। আর এ তারুণ্যই তখন হয়ে ওঠে শুদ্ধতার মূর্ত প্রতীক।

উদাহরণস্বরূপ, ছাত্র-তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘ইয়ুথ এন্ডিং হাঙ্গার-বাংলাদেশ’-এর লক্ষাধিক সদস্য তৃণমূল পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে নানামুখী উন্নয়ন, দক্ষতা ও সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর অংশ হিসেবে ‘বিশ্বব্যাপী সংযুক্ত, স্থানীয়ভাবে সম্পৃক্ত’ – এই প্রতিপাদ্যকে উপজীব্য করে ব্রিটিশ কাউন্সিল ও দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ২০০৯ সাল থেকে ইয়ুথ এন্ডিং হাঙ্গার যুক্ত হয়েছে অ্যাকটিভ সিটিজেনস কর্মসূচিতে। প্রশিক্ষিত এ তরুণরা প্রতিনিয়ত হাতে নিচ্ছে নানামুখী উন্নয়নমূলক সামাজিক উদ্যোগ।

  •     তৃণমূলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চর্চায় ইউনিয়ন পরিষদের সহযোগী হওয়া:
    ইউনিয়ন পরিষদে সাধারণ মানুষের জন্য যে সকল সেবা, সুযোগ-সুবিধা রয়েছে সেগুলো মানুষ যাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সাথে পেতে পারে সেজন্য জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিষদের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা-সহ অন্যান্য পরিকল্পনা প্রণয়ন হওয়া প্রয়োজন। পরিষদের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে তরুণরা পরিষদের সহযোগী হয়ে ইউনিয়নবাসীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও মতামত সংগ্রহ করতে পারে। সেগুলো সন্নিবেশিত করে পরিষদকে জনমুখী পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করতে পারে।ওয়ার্ডসভায় যাতে সর্বস্তরের জনগণ অংশ নেয় সেজন্য তরুণরা জনগণকে সচেতন করতে পারে এবং ওয়ার্ডসভার সপক্ষে প্রচারণামূলক কার্যক্রম চালাতে পারে। গ্রামের সাধারণ মানুষ বিশেষত নারী এবং তরুণরা যাতে তাদের সমস্যা এবং চাহিদাসমূহ ওয়ার্ডসভায় উত্থাপন করতে পারে সেজন্য সহায়তা করতে পারে। মানুষের উত্থাপিত চাহিদা এবং সমস্যাগুলো সন্নিবেশিত করে পরিষদের তথ্যায়ন এবং ডিসপ্লে’র/প্রদর্শনের কাজে সহায়ত করতে পারে। পরিষদের উন্মুক্ত বাজেট অধিবেশনে তরুণরা ব্যাপকহারে অংশ নিতে পারে এবং নিজেদের এলাকার উন্নয়নের ইস্যুসমূহ উত্থাপন করে জনগণ এবং জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করতে পারে।
  •     সমাজ সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম এবং প্রচারাভিযানে নেতৃত্ব পদান:
    তরুণরা নারী এবং সুবিধা ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের সার্বিক জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে বাল্যবিবাহ ও যৌতুক প্রতিরোধে উদ্যোগী ভূমিকা নেবে। মাদকের সর্বনাশা ছোবল থেকে সমাজকে মুক্ত রাখার লক্ষ্যে তরুণ সমাজকে সচেতন ও সংগঠিত করে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলবে। একটি সুস্থ্য, সুন্দর, উদার ও বহুত্ববাদী সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় নিয়মিত কর্মশালা, উঠান বৈঠক করবে। অস্বচ্ছল পরিবারের শিশু-কিশোরদের পড়াশুনায় সহায়তা করবে এবং বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। দুর্নীতি এবং দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদ এবং তরুণদের যৌথ অংশীদারিত্বে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। এর ফলে একদিকে পরিবেশের উন্নয়ন হবে, অন্যদিকে তরুণরা তাদের পড়াশুনার ব্যয় নির্বাহের জন্য আয়ের সংস্থান করতে পারে। সুশাসন ও বিভিন্ন সামাজিক বিষয় সম্পর্কে প্রচারাভিযান পরিচালনার মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্ম জনগণকে এবং সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে সচেতন করতে পারে।
  •     ইতিবাচক মানসিকতাসম্পন্ন এবং আলোকিত প্রজন্ম হিসেবে তরুণ প্রজন্মের গড়ে ওঠা: তরুণ প্রজন্ম যাতে কুসংস্কার ও পশ্চাৎপদতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে; সহিংস চরমপস্থা প্রতিরোধ করতে পারে; বিজ্ঞানমনস্ক এবং যুক্তিবাদী হিসেবে গড়ে উঠতে পারে সে লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে বিজ্ঞান ক্লাব গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিজ্ঞান ক্লাব হবে স্টাডি সার্কেলের মাধ্যমে নিজেদেরকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চর্চা কেন্দ্র।

উপসংহার:
এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হলে তরুণ প্রজন্মকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। মানব কল্যাণ, সমাজে শান্তি-সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা এবং দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আজকের তরুণ সমাজই আগামীতে নেতৃত্ব দিবে। তাই বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে ইতিবাচক মানসিকতায় গড়ে তুলতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে ক্ষমতায়িত করতে পারলে জাতি হিসেবে সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s