‘অ্যাকটিভ সিটিজেনস রিজিওনাল এচিভার্স সামিট-২০১৫’

সচেতন ও সক্রিয় নাগরিক হিসেবে সমাজ উন্নয়নে অবদান রাখতে তরুণদের শপথ গ্রহণ

DSC_0988 DSC_1199DSC_0155 DSC_0247

তরুণদের শিক্ষিত ও দক্ষ হয়ে ওঠার পাশাপাশি সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজ উন্নয়নে অবদান রাখার আহ্বান জানানোর মধ্য দিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ‘অ্যাকটিভ সিটিজেনস রিজিওনাল এচিভার্স সামিট-২০১৫’।  ব্রিটিশ কাউন্সিল-এর সহায়তায় এবং দি হাঙ্গার প্রজেক্ট ও অন্যান্য সহযোগী সংস্থার উদ্যোগে ২৭ মার্চ ২০১৫ ঢাকায় প্রথম সামিট এবং ২৯ মার্চ ২০১৫ চট্টগ্রামে দ্বিতীয় সামিটটি অনুষ্ঠিত হয়।

সকাল ১০.০০টায় ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স-বাংলাদেশ-এ অনুষ্ঠিত প্রথম সামিটটি শুরু হয় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে। সামিটের উদ্বোধন ঘোষণা করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বিচারপতি কাজী এবাদুল হক।  অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব মুনীর হাসান- সাধারণ সম্পাদক, গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি, সৈয়দ মাসুদ হুসেইন- হেড অব সোসাইটি, ব্রিটিশ কাউন্সিল এবং ড. মঞ্জুর আহমেদ- সিনিয়র অ্যাডভাইজার, ইনস্টিটিউশন অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্ট, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি।  উদ্বোধনী পর্বে সভাপতিত্ব করেন দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ও গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. বদিউল আলম মজুমদার।

অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্তভাবে উপস্থাপন করেন ইয়ূথ লিডার জান্নাতুল ফেরদৌসি ও তাওহিদুল ইসলাম। সামিটের শুরুতে দেয়া স্বাগত বক্তব্যে অ্যাকটিভ সিটিজেনস কার্যক্রম সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা তুলে ধরেন ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গার-ঢাকা সিটি ইউনিট-এর সমন্বয়ক আতিক ঢালি।
উদ্বোধনী পর্বে বিচারপতি কাজী এবাদুল হক উপস্থিত ইয়ূথ লিডারদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘একজন নাগরিক হিসেবে তোমাদের কিছু অধিকার রয়েছে, একইসঙ্গে সমাজের প্রতি রয়েছে তোমাদের কিছু দায়-দায়িত্ব।  তোমরা লেখাপড়ার পাশাপাশি সমাজ উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত করতে পারো।  এতে একদিকে তোমাদের অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন হবে, অন্যদিকে সমাজ ও রাষ্ট্র উপকৃত হবে।’

জনাব মুনীর হাসান সক্রেটিস ও প্লেটোর একটি গল্পের সারমর্ম টেনে বলেন, ‘নিজ নিজ কাজটি সঠিকভাবে করাই হলো দেশের জন্য কাজ করা।  আমাদের সমাজে দু ধরনের মানুষ আছে। একদল হলো সক্রিয় ও সচেতন নাগরিক, অন্যদল নিষ্ক্রিয় নাগরিক।  তোমরা যারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সক্রিয় নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছো, আমি মনে করি তোমরাই এ রাষ্ট্রের আলোকবর্তিকা।’

ড. মঞ্জুর আহমেদ বলেন, ‘তোমরা যারা এখানে উপস্থিত হয়েছো, সমাজ উন্নয়নে তোমাদের অনেক অবদান রয়েছে।  তোমাদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক কার্যক্রম দেখে ও শুনে আমি অভিভূত।’

সৈয়দ মাসুদ হুসেইন বলেন, ‘বর্তমানে ৩৮টি দেশে অ্যাকটিভ সিটিজেনস কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।  তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম ও অনন্য উদাহরণ।  কারণ এখানকার সোশ্যাল অ্যাকশন কার্যক্রমগুলো বিশ্বব্যাপী সুনাম বয়ে আনছে।  আর এটি আমাদের তরুণদেরই অর্জন।’

সভাপতির বক্তব্যে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ও গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘তরুণেরা ইচ্ছা করলেই সমাজের জন্য অনেক কিছু করতে পারে।  পুরো বিশ্বই তাদের জন্য উন্মুক্ত। তাই তারা যেভাবে চায়, সেভাবেই বিশ্বকে গড়ে তুলতে পারে।’ এটি এক অফূরন্ত সম্ভাবনা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অতঃপর বাংলাদেশে শিক্ষার বর্তমান অবস্থা নিয়ে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মনোয়ার মোস্তফা। সম্মানিত আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বদরুদ্দিন আহমেদ, আবদুল আল মোহন এবং মোঃ হাবিবুর রহমান।

দুপুরের খাবারের বিরতির পর শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।  এরপর সামাজিক উদ্যোগ পরিকল্পনা নিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন ইয়ূথ লিডার হিমেল, তুষার, ফয়সাল, রুমি, রুমানা, আবির এবং ইউসুফ।
বিকাল ৪.০০টায় অনুষ্ঠিত হয় পুরস্কার বিতরণী ও সমাপনী অনুষ্ঠান।  এতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব মোঃ শফিকুল ইসলাম, ব্রিটিশ কাউন্সিল-এর হেড অব সোসাইটি সৈয়দ মাসুদ হুসেইন, ওয়েব ফাউন্ডেশন-এর এ. ই. ডি তপন কে সাহা, নারী উদ্যোক্তা ও সংগঠক তাজিমা হোসেন মজুমদার এবং দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ-এর উপ-পরিচালক নাছিমা আক্তার জলি।

দিনব্যাপী এ সামিটে আগত তিন শতাধিক অ্যাকটিভ সিটিজেনস ইয়ূথ লিডার তাদের গৃহীত সামাজিক উদ্যোগগুলো (১১টি) প্রদর্শন করে। তারা প্রতিটি উদ্যোগের বর্তমান অবস্থা, অর্জন ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে আগামী দিনের কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার জন্য পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করে।  উদ্বোধনী পর্বের পর অতিথি ও অংশগ্রহণকারীরা গৃহীত সামাজিক উদ্যোগগুলো প্রদর্শন করেন এবং উদ্যোক্তাদের উৎসাহ প্রদান করেন।
২৯ মার্চ ২০১৫ চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সামিটে অংশগ্রহণ করেন পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী।  এতে ইয়ূথ লিডারদের গৃহীত আটটি সামাজিক উদ্যোগ প্রদর্শিত হয়।  সকাল ১০.০০টায় সামিটের উদ্বোধন ঘোষণা করেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (চট্টগ্রাম) ও অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মোঃ খলিলুর রহমান।  বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নাহিদ খান- সেন্টার ম্যানেজার, চট্টগ্রাম ব্রিটিশ কাউন্সিল।

সামিটের উদ্বোধনী ও সমাপনী পর্বে সভাপতিত্ব করেন দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ও গে¬াবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. বদিউল আলম মজুমদার।  সাইতুয়াহ বিনতে আলী ও ইজাজ মাহমুদ ফুয়াদ-এর প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন অ্যাকটিভ সিটিজেনস ইয়ূথ লিডার কলিমুল্লাহ মাশুক।

প্রধান অতিথি মোঃ খলিলুর রহমান, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (চট্টগ্রাম) ইয়ূথ লিডারদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তোমরা তরুণরা লেখাপড়ার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সমাজ উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত করছো।  এজন্য তোমাদের অভিবাদন জানাই।  আমি মনে করি, তোমাদের মত দেশের প্রত্যেক নাগরিক যদি দেশের সেবায় এগিয়ে আসে, তাহলেই আমরা পাবো সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ।’

নাহিদ খান- সেন্টার ম্যানেজার, চট্টগ্রাম ব্রিটিশ কাউন্সিল, বলেন, ‘তোমরা যারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সক্রিয় নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছো, আমি মনে করি তোমরাই এ রাষ্ট্রের আলোকবর্তিকা। তোমাদের যোগ্যতা আর দক্ষতা এই দেশের জন্য সম্পদ।’

সভাপতির বক্তব্যে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমাদের তরুণেরা আগুয়ান হয়েছে। তারা বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন ভবিষ্যৎ গড়তে কাজ শুরু করে দিয়েছে। আমরা যদি তাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও তাদের বিকশিত হওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে আমরা এক অপ্রতিরোধ্য জাতিতে পরিণত হব।’

সকাল ১১.০০টায় ‘সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তরুণদের ভূমিকা’ বিষয়ক একটি বিশেষ সেশন পরিচালনা করেন ড. আসিফ খান। আগ্রহ ও উদ্দীপনার সাথে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা এই অংশগ্রহণমূলক এই আলোচনায় অংশ নেয়।

দুপুর ১২.০০টায় ড. বদিউল আলম মজুমদার-এর পরিচালনায় ‘সামাজিক পুঁজি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তরুণদের ভূমিকা’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা পরিচালিত হয়।  প্যানেলে আলোচক হিসেবে অংশ নেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম-এর উপাচার্য প্রভাত চন্দ্র বড়ুয়া, অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী এবং ড. আসিফ খান। দুপুরের বিরতির পর উপস্থিত শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বিতর্ক ও কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।

সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ইস্ট ডেলটা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য মোহাম্মদ সিকান্দার রহমান।  বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নুসরাত জাহান- প্রকল্প পরিচালক, সোশ্যাল, ব্রিটিশ কাউন্সিল। সবশেষে, পুরস্কার বিতরণী ও মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দিনব্যাপী এ সামিটের কার্যক্রম।

প্রসঙ্গত, একটি শান্তি ও সোহার্দ্যরে পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষ্যে ব্রিটিশ কাউন্সিল-এর সহায়তায় সারাদেশে অ্যাকটিভ সিটিজেনস কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।  ২০০৯ সাল থেকে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট এ কার্যক্রমের সাথে যুক্ত রয়েছে।  অ্যাকটিভ সিটিজেন কর্মসূচি একদল তরুণ-তরুণীর মাঝে আস্থা ও বোঝা-পড়া সৃষ্টি এবং ইয়ূথ লিডার হিসেবে গড়ে উঠতে অনুপ্রাণিত, সংগঠিত ও ক্ষমতায়িত করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।  ফলে এই তরুণেরা নাগরিকত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্থানীয় সম্পৃক্ততা ও বৈশ্বিক সংযুক্তির মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *