আমরা করব জয় ৭১ তম সংখ্যা (২য় সংস্করণ)

সম্পাদকীয়

৩৯ বছর পরও আমরা স্বাধীনতাটাকে খুঁজছি- বিখ্যাত গায়ক হায়দার হোসেনের অতি জনপ্রিয় গানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কলি, ৩০ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাটাকে খুঁজছি। এ গানে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের আমাদের অর্জন সমপর্কে তিনি তাঁর মনের আকুতি প্রকাশ করেছেন। স্বাধীনতা থেকে প্রাপ্তি নিয়ে শিল্পীর ভাষায় তিনি আক্ষেপ করেছেন। আক্ষেপ করেছেন জাতি হিসেবে আমাদের অসংখ্য ব্যর্থতা নিয়ে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, নেই বর্গি, নেই ইংরেজ, নেই পাকিস্তানি হানাদার/ আজ তবু কেন আমার মনে শূন্যতা আর হাহাকার/ আজ তবু কি লাখো শহীদের রক্ত যাবে বৃথা/ আজ তবু কি ভুলতে বসেছি স্বাধীনতার ইতিকথা। ১৬ ডিসেম্বর আমরা স্বাধীনতার ৩৯তম বার্ষিকী পালন করলাম। আর কিছুদিন পরই স্বাধীনতার চার দশক পূর্ণ হবে। ৪০ বছর একটি জাতির জীবনে কম সময় নয়। এই দীর্ঘ সময়ে অনেক অর্জন আমাদের ঘরে ওঠার কথা ছিল। কথা ছিল অনেক সমস্যা সমাধানের। কিন’ তা কি হয়েছে? জাতি হিসেবে এ প্রশ্নের মুখোমুখি আজ আমাদের হওয়া প্রয়োজন। নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন আমাদের ব্যর্থতার কারণগুলো। তা না হলে স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস পালন শুধু আনুষ্ঠানিকতার বেড়াজালে আটকা পড়ে যাবে এবং এর সত্যিকারের ইতিকথা আমাদের দৃষ্টির অগোচরেই থেকে যাবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এবং অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে। মুক্তিযুদ্ধের পেছনে ছিল কতগুলো চেতনা ও মূল্যবোধ, যা বাস-বায়নের লক্ষ্যেই অসংখ্য মানুষ আত্মত্যাগ করেছিল। তাই স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্জন-ব্যর্থতার মূল্যায়নে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই মূলত আমাদের মাপকাঠি হওয়া উচিত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে আমাদের দেশে অনেক বিতর্ক হয়। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের লক্ষ্যে এটি স্লোগান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। অভিযোগ তোলা হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, এমনকি পুরো মুক্তিযুদ্ধকেই দলীয়করণের। কিন’ আসলেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাগুলো কী? আমরা মনে করি, সততা, সমতা, একতা, ন্যায়পরায়ণতা, জনকল্যাণ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা। এগুলো অর্জনের সম্মিলিত প্রত্যাশার ভিত্তিতেই দল-মত, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষনির্বিশেষে আমরা বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে যার যা কিছু ছিল, তা নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করেছিলাম এবং বিজয়ীও হয়েছিলাম। এসব চেতনা বা মূল্যবোধের অনেকগুলোই আমাদের সংবিধানেও অন-র্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন’ গত ৩৯ বছরে এগুলো কি বাস-বে রূপায়িত হয়েছে? সততার কথায় আসা যাক। পাকিস-ানিদের অনৈতিকতা, অসততা এবং আমাদের প্রতি অবিচারই মুক্তিযুদ্ধের পেছনের অন্যতম কারণ। তাই অনেকেরই আকাঙ্ক্ষা ছিল, বাংলাদেশ হবে সততা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে গড়া একটি রাষ্ট্র। কিন’ দুর্ভাগ্যবশত অন্যায়, অবিচার ও অনৈতিকতাই যেন আমাদের নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন হয়ে গেছে আমাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আমরা পাঁচ-পাঁচবার পৃথিবীর সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস- জাতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছি। বর্তমানেও এ ক্ষেত্রে আমরা ভালো অবস’ানে নেই। দুর্নীতি দূরীকরণের সুসপষ্ট অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় এলেও বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না। গত দুই বছরে কোনো রুই-কাতলাকে দুর্নীতির অভিযোগে দৃষ্টান-মূলক শাসি- দেওয়ার কথা আমরা শুনিনি। বরং আইন পরিবর্তন এবং অসহযোগিতার মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনকে অকার্যকর করার চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া দিনবদলের সনদে ক্ষমতাধরদের সমপদের হিসাব প্রদানের সুসপষ্ট অঙ্গীকার সত্ত্বেও এ পর্যন- তা করা হয়নি। প্রণয়ন করা হয়নি আমাদের সাংসদদের জন্য আচরণবিধি, যাতে তাঁরা তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো প্রকাশ করতে বাধ্য হতেন। সমতা ও ন্যায়ানুগ একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পেছনের অন্যতম প
রেরণা। কিন’ দুর্ভাগ্যবশত গত ৩৯ বছরে আমরা একটি চরম অসম সমাজে পরিণত হয়েছি। ন্যায়পরায়ণতার ধারণাটি যেন আজ আমাদের কাছে অর্থহীন ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ক্রমাগত প্রকটতর হয়েছে। বৈষম্য আর বঞ্চনা আমাদের জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের আজ যেন নিত্যদিনের সঙ্গী এবং আয়, সমপদ ও সুযোগের বৈষম্যই আমাদের দেশে দারির্দ্যকে স’ায়িত্ব দিয়েছে। বস’ত, ধনাঢ্যরাই আজ রুলিং ক্লাসে বা রাষ্ট্রের অধিপতিতে পরিণত হয়েছেন এবং প্রায় সব সরকারি সুযোগ-সুবিধাই এখন তাঁদের করায়ত্ত। পুরো রাষ্ট্রই যেন এখন পরিচালিত হয় তাঁদের স্বার্থে এবং তাঁদের স্বার্থপরতা সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। জনকল্যাণ এখন নিতান-ই স্লোগান মাত্র। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের অধিকাংশই সাধারণ মানুষ এবং তাদের সন-ান হলেও তারা হয়ে গেছে আজ সমাজের উচ্চবিত্তদের করুণার পাত্র। এদের অনেকের জন্য আজ মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকাই দুরূহ হয়ে পড়েছে। অনেকের আশঙ্কা, এমন পরিসি’তি আমাদের এক সম্ভাব্য অসি’তিশীল পরিসি’তির দিকে ঠেলে দিতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল একটি সম্মিলিত প্রত্যাশা এবং তার ভিত্তিতে একতা। শুধু ১৯৭১ সালেই নয়, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনেও আমাদের পুরো জাতি ছিল একতাবদ্ধ। অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর একই ভাষা, একই সংস্কৃতি, এমনকি একই ধর্ম হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কারণে আজ আমরা দুটি ক্যামেপ বিভক্ত হয়ে পড়েছি। এ দুই ক্যামেপর মধ্যকার বিবাদের অন্যতম কারণ কতগুলো অর্থহীন স্লোগান এবং কৃত্রিম প্রতীক, যার ভিত্তিতে সৃষ্টি হয়েছে কতগুলো গুরুত্বহীন ইস্যু, যেমন বাঙালি জাতীয়তাবাদ বনাম বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, আপাতত যার কোনো সমাধান নেই। স্বাধীনতার ৩৯ বছর পরও আমরা যেন অযথা এবং অযৌক্তিকভাবে হানাহানিতে লিপ্ত এক কলহপ্রবণ জাতিতে পরিণত হয়েছি। জাতির অগ্রগতির পরিবর্তে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসাপরায়ণতাই যেন আমাদের রাজনীতিবিদদের জন্য মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বিকৃত রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চার ফলে সমাজে আজ যে অসি’রতার সৃষ্টি হয়েছে, আমরা জানি না, তার পরিণতি কী। আশা করি, আমাদের দুই নেত্রী, যাঁরা দু-দুবার প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করেছিলেন কিংবা করছেন এবং যাঁদের রয়েছে ব্যাপক গণসমর্থন, তাঁরা জানেন, জাতিকে কোন গন-ব্যে তাঁরা নিয়ে যাচ্ছেন।

 

ড. বদিউল আলম মজুমদার, গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর,দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ

ময়মনসিংহ অঞ্চলের খবরা-খবর
ঝিনাইদহ অঞ্চলে খবরা-খবর
রাজশাহী অঞ্চলের খবরা-খবর
রংপুর অঞ্চলের খবরা-খবর
কুমিল্লা অঞ্চলের খবরা-খবর
ঢাকা অঞ্চলের খবরা-খবর
খুলনা অঞ্চলের খবর
সিলেট অঞ্চলের খবর

সেচ্ছা শ্রমে আলোকিত যারা

অন্যন্য খবর
সেচ্ছাব্রতী সামাজিক উদ্দোগ মেলা

 

Advertisements