“জাতীয় বাজেট ও তরুণদের ভাবনা” শীর্ষক কর্মশালা অনুষ্ঠিত

1

১৬ মে, ২০০৯ ঢাকার আইডিবি ভবন মিলনায়তনে স্বেচ্ছাব্রতী সংস্থা ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ’-এর অনুপ্রেরণায় সৃষ্ট ছাত্র সংগঠন ‘ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গার-বাংলাদেশ’-এর উদ্যোগে এবং ‘ইউএন মিলেনিয়াম ক্যাম্পেইন’-এর সহযোগিতায় ‘‌‌‌জাতীয় বাজেট ও তরুণদের ভাবনা’ শীর্ষক একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১০টায় উদ্বোধনী অধিবেশনে ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গারের ইয়ূথ এক্টিভিস্ট অশোক বিশ্বাসের সভাপতিত্বে কর্মশালায় ‌‌‘বাংলাদেশের যুব সমাজ ও দিনবদলের বাজেটের প্রতীক্ষা’ শিরোনামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সম্পাদক জনাব মুনির হাসান। এসময় সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনিসুর রহমান, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ও গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. বদিউল আলম মজুমদার, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী বাংলাদেশ এর সহকারী কান্ট্রি ডিরেক্টর জনাব কেএএম মোরশেদ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ই-গর্ভনেন্স বিষয়ক পলিসি এ্যাডভাইজার জনাব আনীর চৌধুরী, দৈনিক প্রথম আলো’র বিজনেস এডিটর জনাব শওকত হোসেন মাসুম এবং ইউএন মিলেনিয়াম ক্যাম্পেইন বাংলাদেশ এর ন্যাশনাল এমডিজি’এস এ্যাডভোকেসী এন্ড কমিউনিকেশন এক্সপার্ট জনাব মনীষা বিশ্বাস। কর্মশালার শুরুতেই সমবেতভাবে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। এরপর স্বাগত বক্তব্য রাখেন রংপুর কারমাইকেল কলেজের ছাত্রী মেহের নাজমুন ইসলাম তিশা। তিনি বলেন, এ কর্মশালার মধ্য দিয়ে বাজেট সম্পর্কে আমরা আমাদের চিন্তা-ভাবনাগুলো নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে দিতে চাই।

2ইউএন মিলেনিয়াম ক্যাম্পেইনের প্রতিনিধি জনাব মনীষা বিশ্বাস সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যের কথা তুলে ধরে বলেন এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই এগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হলে যুব সমাজকে দায়িত্ব নিতে হবে। এছাড়া তিনি স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে মূল্যায়ন করারও দাবি জানান। আজকের এই কর্মশালার মাধ্যমে এধরনের একটি উদ্যোগ শুরু হলো এবং পরবর্তী সময়েও সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমরা বাংলাদেশের যুবকদের নিয়ে কাজ করে যাবো।

মূল প্রবন্ধে জনাব মুনির হাসান বলেন, আমাদের দেশের যুবনীতিকে যুগোপযোগী করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, যুব উন্নয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুবদের জন্য বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় চলমান বাজেটে ১৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না। মূল প্রবন্ধে তিনি আরো বলেন, আজকের দুনিয়ায় জ্ঞানভিত্তিক সমাজের কোনো বিকল্প নেই। তাই যুবদের যুগোপযোগী শিক্ষা এবং তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া জরুরি। তিনি আরো বলেন, সরকার ২০২১ সালে একটি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা করেছেন। আর এ লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে বেশি কাজ করবে যুবরাই। আমাদের দায়িত্ব তাদের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা। দিনবদলের দিন যে শুরু হয়েছে তার প্রতিফলন যদি এবারের আর আগামী দিনের বাজেটে থাকে, তাহলে যুবরাই আমাদের দিনগুলোকে বদলে দিতে পারবে।

3বাজেট, অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে দেবে আগামী কয়েক বছরের। তাই এই বাজেটে যুব সমাজকে একটি ‘সেক্টর’ হিসেবে বিবেচনা না করে একটা ‘স্পেকট্রাম’ হিসেবে দেখতে হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পলিসি এডভাইজার জনাব আনীর চৌধুরী বলেন, শুধু টাকার অঙ্কে বাজেটের কথা চিন্তা না করে, সেটা কতটুকু কাজে লাগছে, তা দিয়ে কী তৈরি হচ্ছে এবং সেটা আসলেই দেশ গড়ার কাজে ব্যয় হচ্ছে কি-না এ সকল বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে আজকে আমাদের বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্ব বাজারে শ্রমের যে চাহিদা রয়েছে সেভাবে আমরা সঠিক জনগোষ্ঠী তৈরি করতে পারছি কি-না তার প্রতিফলন এই বাজেটে থাকা চাই। একুশ শতকের উপযোগী দক্ষতা সৃষ্টির জন্য প্রাইভেট সেক্টরসহ সকলে মিলে কাজ করার কথাও বলেন তিনি। এছাড়া তিনি ভোটার আইডি কার্ডের সাফল্যের কথা তুলে ধরে বলেন, পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুসারে আমাদের দেশের ১ লক্ষ আইসিটি ওয়ার্কার রয়েছে কিন্তু তাদেরকে কাজে লাগানো হচ্ছে না। তাই আইসিটি’র ক্ষেত্রে আমাদের বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত। সরকারের ২ বছরের ন্যাশনাল সার্ভিসের কথা উল্লেখ করে তিনি তরুণদের উদ্দেশ্যে বলেন, এটা কীভাবে হলে দেশের জন্য ও যুব সমাজের জন্য ভালো হয় তা আপনাদের চিন্তা করতে হবে, বলতে হবে। এছাড়া পিপলস্ ভয়েস থ্রু ইয়ূথ, ৫ বছর পরে অন্যদেশের সাথে তুলনা করে দেখা, ইয়ূথ পার্লামেন্ট এসব বিষয় নিয়েও নীতি-নির্ধারকদের ভাবার আহ্বান জানান তিনি।

বাজেট দিয়ে সরকারের নীতিগুলো বোঝা যায়। তাই বাজেট সম্পর্কে জানা ও ভালোভাবে দেখা উচিত উল্লেখ করে তরুণদের উদ্দেশ্যে দৈনিক প্রথম আলো’র বিজনেস এডিটর জনাব শওকত হোসেন মাসুম বলেন, বেসরকারি খাত কীভাবে কর্মসংস্থানের জন্য এগিয়ে আসবে তার দিকে বর্তমান বাজেটে গুরুত্ব থাকা উচিত। তিনি বলেন, বাজেটের মাধ্যমে সত্যিকারভাবে শিক্ষার মানোন্নয়নে খুব বেশি ভূমিকা আমরা দেখতে পাই না, লেখাপড়া শেষ করে পছন্দ অনুযায়ী কাজ পাবার নিশ্চয়তা আমরা পাই না। আশা করি এবার এ সকল ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আমরা দেখতে পাবো।

‘ইয়ূথ’, বাজেটের ক্ষেত্রে একটা ‘নতুন ভাবনা’ উল্লেখ করে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি বাংলাদেশ এর সহকারী কান্ট্রি ডিরেক্টর জনাব কেএএম মোরশেদ বলেন, বাজেটে এ বিষয়টি নিয়ে আসা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, কী কী পাই নাই এবং কী কী পেতে হবে তার দিকে আমাদের দৃষ্টি থাকতে হবে। সংখ্যালঘুদের দিকে নজর দিতে হবে। তাদের ভাবনাকেও এই আলোচনায় নিয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

“মা তোর বদন খানি মলিন হলে, আমি নয়ন জলে ভাসি…” – জাতীয় সঙ্গীতের শেষ পংক্তির কথা উল্লেখ করে তরুণদের উদ্দেশ্যে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ এর গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. বদিউল আলম মজুমদার তাঁর বক্তব্যে বলেন, এই পংক্তির তাৎপর্য আমাদেরকে অনুধাবন করতে হবে। এখানে মা আমার রাষ্ট্র, আমার দেশ। আমরা দেশকে ভালোবাসি, দেশের নাগরিক, দেশের মালিক। মালিকের অধিকার ও দায়িত্ব থাকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার, দেশ গড়ার ও সমস্যা সমাধানের। আর এখানেই সরকারের বাজেটের গুরুত্ব। দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য তারা যাতে অবদান রাখতে পারে সেই লক্ষ্যে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে বাজেটের ভূমিকা। বাজেট প্রণয়ন শুধু কেরানির কাজ নয়, এর মাধ্যমে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অসংখ্য মানুষ যাতে দেশ গড়ার কাজে অবদান রাখতে পারে সে সুযোগ সৃষ্টি করার। আর তারা তা পারবে যদি তাদের অন্তর্নিহিত শক্তির, আত্মশক্তির বিকাশ ঘটে। সরকারের ভূমিকা হবে মূলত এক্ষেত্রে অনুঘটকের, আর অনুঘটকের ভূমিকার প্রতিফলন হলো এই বাজেট। তিনি বলেন, কার বিকাশের কতটুকু সুযোগ করে দেয়া হলো এই বাজেটের মধ্য দিয়ে তা আমরা দেখতে চাই, যাতে তার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র গঠনের কাজে তারা অবদান রাখতে পারে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রকে গঠন করতে হয় মানুষের বিকাশের মাধ্যমে। সেই রাষ্ট্রই বেশি শক্তিশালী যে রাষ্ট্র মানুষের বিকাশের সুযোগ বেশি দিয়েছে। আমরা কি বিরাট অবদান রাখতে পারি না? – এই প্রশ্ন উত্থাপন করে তিনি আরো বলেন, আমরা তরুণরা একটা বিরাট কাজ করতে পারি কি না একবিংশ শতাব্দীর রাস্তা খুলে দেবার জন্য, স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে সাক্ষরতার আন্দোলন গড়ে তুলতে পারি কি না, সাক্ষরতার মাধ্যমে তাদেরকে এমন একটা পর্যায়ে আনা যাতে তারা সচেতনতার পর্যায়ে আসতে পারে এবং আধুনিকতার সংস্পর্শে আসারও সুযোগ পায়। আর বাজেটের মাধ্যমে একটা ঘোষণা আসতে পারে যে এটা আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার।

4শুধুমাত্র খেলাধূলা নয়, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে আমরা কীভাবে টাইগার হতে পারি সে কথা আমরা কেউ ভাবছি না উল্লেখ করে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনিসুর রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেন, আমাদের সামনে নিরক্ষরতা দূরীকরণের একটা অপূর্ব সুযোগ এসেছে, একটা দু’টো বড় ছুটিতে ধাক্কা দিলেই অন্তত এক বছরের মধ্যেই প্রাথমিক শিক্ষায় সকলকে শিক্ষিত করে তুলতে পারি আমরা, তাই আসুন আমরা সবাই মিলে সরকারের কাছে দাবি করি। এক বছরে শিক্ষিত হতে পারে সারা দেশ। এক্ষেত্রে দি হাঙ্গার প্রজেক্টের স্বেচ্ছাসেবকদের কর্মকাণ্ড উদাহরণ হিসেবে রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, প্রথমে মানুষকে মৌলিক সাক্ষরতা অর্জন করতে হবে তা না হলে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নও কখনোই বাস্তবায়িত হবে না। এ সময় তিনি ব্যক্তি উন্নয়নের পরিবর্তে কমিউনিটিভিত্তিক সেবা দর্শনের ওপরও বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেন। স্বেচ্ছাসেবক ধারণাকে গুরুত্ব প্রদানের কথা তুলে ধরে তিনি আরো বলেন, দেশের উন্নয়ন সরকার একা করতে পারে না। এই ব্যাপারে আমাদের সকলকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এগুতে হবে। তিনি বলেন, শিক্ষিত না হলে দেশ উঠে দাঁড়াতে পারে না। আজকে আমরা মূলত অশিক্ষিত একটা সস্তা শ্রমের দেশ। যে সমস্ত দেশ বিশ্বে অনেক আগে থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে সে সকল দেশে প্রথমেই একটা গণশিক্ষা আন্দোলন হয়েছে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে আমরা কীভাবে টাইগার হতে পারি সে কথা আমরা কেউ ভাবছি না। আমরা সেই টাইগার হতে চাই কি না? আর এটা করতে হলে ভূমি সংস্কার ও শিক্ষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে আমাদেরকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। তবে শুধুমাত্র ঢাকায় বসে এ ধরনের আলোচনা করে কোন লাভ হবে না। এ ধরনের আলোচনা গ্রামে গ্রামে মাঠে মাঠে হওয়া উচিত। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে ছোট ছোট যুব পার্লামেন্ট করার কথাও তিনি তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেন।

5সভাপতির বক্তব্যে স্বেচ্ছাসেবক জনাব অশোক বিশ্বাস বলেন, বাজেট প্রণয়নের আগে সরকার ব্যবসায়ী, সুশীল সমাজ, শিল্প মালিকদের সাথে আলোচনা করে পরামর্শ গ্রহণ করে। কিন্তু যারা দেশের সবচেয়ে বড় অংশ এবং দেশ গঠনে যাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য তাদের সাথে কোন আলোচনা করা হয় না। তাই বাজেট প্রণয়নের আগে তরুণ-তরুণীদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে মতামত প্রদানের সুযোগ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে থাকা উচিত। আজকের এই কর্মশালার মধ্য দিয়ে এর একটি সূচনা হলো, আগামীতেও এটা অব্যাহত থাকবে এটাই প্রত্যাশা করি।

সকালের অধিবেশনে অন্যান্যের মধ্যে বিভিন্ন সংগঠনের যুব প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। প্রতিবন্ধীদের অবস্থা ও অবস্থানের কথা তুলে ধরে এডিডির ফিরোজা খাতুন সীমা বলেন, দেশের প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ লোক প্রতিবন্ধী, এদের মধ্যে ৭০ লক্ষই তরুণ। তাই শিক্ষা ও দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাদের জন্যও যেন বরাদ্দ থাকে এর গুরুত্ব তুলে ধরে যুগান্তর স্বজন সমাবেশের মিনহাজ মোরশেদ বলেন, টেকনোলজির প্রসার ও সহজলভ্যতার ক্ষেত্রে যেন বাজেটে বরাদ্দ প্রদান করা হয়। এছাড়া ইয়ূথ পার্লামেন্ট হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সবাইকে বাজেট পড়ে দেখার আহ্বান জানান বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক-এর তারিক এজাজ। স্পেস বাংলাদেশ-এর আল মামুন বলেন, আত্ম-কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ও কর্মমুখি শিক্ষায় উৎসাহিত করার জন্য বাজেটে গুরুত্ব দেয়া উচিত। এছাড়া ঋণ প্রাপ্তির ব্যবস্থাগুলো সহজ করারও দাবি জানান তিনি। উদ্ভাবনকারীদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের দাবি জানান জাগোরী’র ওমর সায়েম ইসমাইল। তিনি বলেন, পরিবেশের ক্ষেত্রে শিল্প কারখানাগুলোতে শোধনাগারের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা উচিত। বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সুব্রত দেবনাথ বলেন, সরকারের কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে তা আরো স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে, যাতে এটা সকলেই বুঝতে পারে। যুব সমাজের উন্নয়ন ও উৎপাদন বান্ধব বাজেট করার আহ্বান জানিয়ে ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গার প্রতিনিধি ও সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের ছাত্র নজরুল বলেন, শিক্ষার সার্টিফিকেট দিয়ে শিক্ষার্থীরা যাতে ঋণ নিতে পারে সে ধরনের ব্যবস্থা থাকা উচিত। এছাড়া দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ক্ষুদ্র কুটির শিল্প গড়ে তোলারও দাবি জানান তিনি। দলিত যুব ফোরামের প্রতিনিধি ডেভিট রাজু বলেন, আমি দলিত হয়ে কাজ করে পড়ালেখা করব তার সুযোগ থাকা উচিত। কারণ আমরাও এ দেশের নাগরিক।

6জাতীয় উন্নয়ন ও বাজেট সম্পর্কে তরুণদের চিন্তা ও আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলো তুলে ধরা; তরুণদের এ ভাবনাগুলো নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া এবং তরুণ সমাজের উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকরি উদ্যোগ গ্রহণে প্রণোদনা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য নিয়ে দিনব্যাপী আয়োজিত এ কর্মশালায় ৩৩টি জেলা ও সমমনা ১৫টি যুবসংগঠনের পক্ষ থেকে প্রায় ১০০ জন তরুণ-তরুণী অংশগ্রহণ করেন।

কর্মশালায় উপস্থিত তরুণ-তরুণীরা কর্মসংস্থান, দক্ষতা বৃদ্ধি, নীতি-নির্ধারণে অংশগ্রহণ ও স্বেচ্ছাশ্রম এ ৪টি গ্রুপে ভাগ হয়ে গ্রুপভিত্তিক আলোচনা করে এবং কিছু সুপারিশ উপস্থাপন করে। সুপারিশগুলো হলো:
১. কারিগরী ও বাস্তবমুখী শিক্ষার প্রসার;
২. সহজশর্তে ঋণ প্রদান ও তার যথাযথ ব্যবহার;
৩. নিয়োগ ক্ষেত্রে দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতিসহ সকল দুর্নীতি রোধ;
৪. কৃষিকে আধুনিকায়ন এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি;
৫. বিদেশে শ্রম বাজার তৈরীতে রাষ্ট্রের ভূমিকা বৃদ্ধিকরণ;

বিষয়: দক্ষতা বৃদ্ধি
১. এসএসসি পরীক্ষার পর তিনমাস যেকোন ধরণের দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রকল্প সরকারী উদ্যোগে চালু করা;
২. তিনটি শ্রেণীর জন্য মাতৃভাষা ও আন্তর্জাতিক ভাষায় দক্ষতাবৃদ্ধি করা
– শিক্ষিত
– অর্ধশিক্ষিত
– নিরক্ষর (বিদেশগামী শ্রমিক)
৩. দেশের সর্বস্তরে খন্ডকালীন চাকুরীর ব্যবস্থা করা;
৪. গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি, কুটির শিল্প, হালকা শিল্প, মাঝারী শিল্পে ট্রেনিং সেন্টার চালু করা;
৫. বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে ইন্টার্নি ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের ব্যবস্থা করা;
৬. তরুণদের প্রতিভার (বিশেষ) বিকাশের জন্য প্রতিভার অন্বেষণ কর্মসূচী ব্যাপকভাবে চালু করা;
৭. দেশের সকল লাভজনক ও অলাভজনক কর্মকাণ্ডে স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে তরুণদেরকে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়া যাতে করে তাদের বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হয়;

বিষয়: নীতি নির্ধারণে অংশগ্রহণ
১. টেলি সেন্টার, ওয়াই ম্যাক্স, ইন্টারনেট প্রভৃতি সুবিধা ব্যবহারের মাধ্যমে সরকার একটি আই টি বান্ধব শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে যার মাধ্যমে তথ্য সমৃদ্ধ জাতি গঠন করা সম্ভব হবে।
২. তরুণদের নিয়ে একটি প্লাটফর্ম গঠন করা যেখানে তরুণরা নীতি নির্ধারণী বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারে এবং নতুন নীতির জন্য সুপারিশ করতে পারে;
৩. ছাত্রদের ছুটির সময়টাতে সামাজিক কাজে জড়িত করা এবং শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভূক্তির মাধ্যমে তা বাধ্যতামূলক করা;

বিষয়: স্বেচ্ছাশ্রম
১. স্বেচ্ছাব্রতী কাজের স্বীকৃতি ও উৎসাহ প্রদান (স্থানীয় এবং জাতীয়ভাবে, প্রাতিষ্ঠানিক, সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, মিডিয়া);
২. কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবকদের অভিজ্ঞতাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা;
৩. স্বেচ্ছব্রতী কাজের মাঝে বিভিন্ন প্রকার দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ প্রদান;
৪. সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ্যক্রমের মধ্যে স্বেচ্ছাশ্রমের গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করা এবং সুযোগ সৃষ্টি;
৫. স্বেচ্ছাশ্রমের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন;

তরুণ-তরুণীরা জানায়, তারা এগুলো বাস্তবায়নের পরিবেশ চায়। একইসাথে এ সকল কার্যক্রমের মনিটরিং ও ইভাল্যুয়েশনের ওপরও তারা বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেন। তারা আগামী বাজেটে এগুলোর প্রতিফলন ঘটানোর দাবি উত্থাপন করে আরো বলেন, তাহলেই আমরা ২০২১ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ পাবো।

এ কথা সত্য যে দেশের ৩৮ ভাগ যুব-সমাজ। তাই দেশের যুব-সমাজকে অবহেলিত রেখে, পিছিয়ে রেখে দেশের উন্নয়ন কখনোই সম্ভব না উল্লেখ করে মাননীয় সংসদ সদস্য ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী বলেন, যে বিষয়গুলো এখানে উঠে এসেছে সেগুলো আমরা গুরুত্ব সহকারে বোঝার ও বাস্তবে রূপদানের চেষ্টা করব। তিনি বলেন, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধির সাথে শিক্ষার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত বিবেচনা করে এখানে কী করা যেতে পারে তা ভাবার অবকাশ আছে। এছাড়া তিনি দেশের উন্নয়নে যুব সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, যুবনীতিকে উন্নত করা, আইটির প্রসার, ভাষা শিক্ষা, কমিউনিটি সার্ভিস ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেন।

যে দাবিগুলো সুপারিশ আকারে উঠে এসেছে সেগুলোকে বাংলাদেশের যুব সমাজের ভাবনা হিসেবে তুলে ধরে মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, এই বাজেটে যুব-সমাজ যে চিন্তা দিলেন, এর বাস্তবায়ন ঘটবে কি না এ প্রশ্ন আমার মধ্যেও রয়েছে। তিনি বলেন, সরকারিভাবে ভাষা শিক্ষার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। মফস্বলে শিক্ষার কোনো একাডেমি বা প্রতিষ্ঠান নেই। তিনি বলেন, কারিগরি শিক্ষা এবং ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই নেয়া যেতে পারে। এছাড়া বিষয়গুলিকে সরকারি পরিকল্পনার মধ্যে নিয়ে আসা গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, যুব সমাজের এই ধরনের বক্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যুব সমাজের এই আলোচনা থেকে নতুন দুয়ার খুলেছে। আমাদের নিজেদের সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বাস্তবমুখি শিক্ষাকে নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের আয়ের সিংহভাগ আমরা মানব সম্পদ রেমিটেন্স থেকে পাই। তাই তাদের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করার কথা আমাদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। সরকারের সকল প্রতিষ্ঠানেই সেবামূলক সার্ভিসের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মত ব্যক্ত করেন।

7এই কর্মশালায় উপস্থিত হতে পেরে আমি গর্বিত ও আনন্দিত, যুবকরা জাতির জন্য অনেক কিছুই করতে পারে উল্লেখ করে সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাননীয় যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জনাব মোঃ আহাদ আলী সরকার বলেন, আমরা আগামী দিনে আমাদের ছেলে-মেয়েদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। তাদের বেকারত্ব দূর করতে চাই। এজন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বাজেট প্রণয়নের আগে অর্থমন্ত্রী যুবদের সাথে আলোচনা করার বিষয়টি অর্থমন্ত্রী এবং কর্মশালার গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশসমূহ প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করারও প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন তিনি। তিনি স্বেচ্ছাসেবীদেরকে সম্মানিত করার বিষয়টির সাথে একমত পোষণ করেন। এছাড়া তিনি সরকার প্রধানসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি জাতীয় সেমিনার করারও পরামর্শ প্রদান করেন। এছাড়া মন্ত্রী তার বক্তৃতায় হাতে-কলমে ভোকেশনাল ট্রেনিং প্রদান-এর ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, আমরা যদি ২০২১ সালের মধ্যে প্রত্যেক পরিবারে একজন করে চাকুরী দিতে চাই তাহলে প্রতি বছর ২০ লক্ষ ছেলে এবং মেয়েকে ট্রেনিং প্রদানের কর্মসূচি সরকারকে গ্রহণ করতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। বেকারত্ব ঘোচানোর কর্মসূচিকে আমরা ব্যর্থ হতে দিতে চাই না। তিনি এসএসসি পরীক্ষা শেষ করে তারা যাতে ঐ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারে তার ব্যবস্থা থাকা উচিত বলেও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয় কিন্তু এই সরকার এখনও এই ধরনের কোন ঘটনা ঘটতে দেয়নি এবং দুর্নীতিকে এ সরকার প্রশ্রয় দেবে না বলেও জানান তিনি। যুব অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণগুলো শুধু প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রশিক্ষকদের গ্রামে গ্রামে গিয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের চিন্তার সাথে তিনি একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন সরকার ২০১৫ সালের মধ্যে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই লক্ষ্যসমূহ অর্জনে কোন কোন ক্ষেত্রে অর্থের প্রয়োজন হলেও অনেকগুলো ইস্যুতে গণজাগরণের মধ্য দিয়ে অগ্রগতি অর্জন সম্ভব। যেমন, সকল ছেলে-মেয়ের স্কুলে ভর্তি ও পড়াশুনা নিশ্চিত করা, শিক্ষার মান উন্নয়ন, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, পরিবেশের উন্নয়ন, আত্ম-কর্মসংস্থান ইত্যাদি অনেক সমস্যা আমরা ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও সমবেত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাধান করতে পারি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে আমাদের যুবসমাজ।

8কর্মশালার শেষদিকে অংশগ্রহণকারী তরুণরা তাদের এলাকায় স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে নিরক্ষরতা দূরীকরণ আন্দোলন শুরু করবে বলে এবং একজন তরুণ দশজন নিরক্ষর ব্যক্তিকে সাক্ষরজ্ঞান দান করবে বলে হাত তুলে অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। সকলের সমবেত কন্ঠে ‘আমরা করব জয়……..’ এই গানের মধ্যে দিয়ে দিনব্যাপী কর্মশালা সমাপ্ত হয়।

আমরা করব জয়-৬৭

Advertisements

One comment

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে।