এরশাদনগর গণশিক্ষা স্কুল, কুষ্টিয়া


গত ৯ জুন, ০৮ তারিখে নিরক্ষরতা মুক্ত সমাজ গঠন করার উদ্দেশ্য নিয়ে কুষ্টিয়া জেলা ইউনিট নিরক্ষরতা দূরীকরণ অভিযান শুরু করে। এ কাজকে গতিশীল করার লক্ষ্যে প্রথমে একটি পথ নাটক তৈরী হয়। নাটকটিতে মানুষ অক্ষরজ্ঞানহীন থাকলে তার জীবনে কি কি ক্ষতি হতে পারে তা ফুটিয়ে তোলা হয়। ফলে নাটকটি দেখার পর তারা নিজেরাই লেখাপড়া শেখার জন্য খুবই আগ্রহী হয়ে উঠে। নাটক করার পর এরশাদনগর গুচ্ছগ্রামের সর্দ্দার দায়িত্ব নেয় তার এলাকার কারা কারা পড়বে তাদের লিস্ট তৈরী এবং উপকরণ কেনার জন্য আগ্রহীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ২৫ টাকা করে সংগ্রহ করার। এলাকার সকলে মিলে ঠিক করে তাদের ক্লাব ঘরটি এই কাজে ব্যবহৃত হবে। শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরী এবং অর্থ সংগ্রহের পর স্বেচ্ছাসেবকরা উপকরণ ক্রয় করে দুইটি ব্যাচে পড়ানো শুরু করে। বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত মহিলাদের এবং সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত পুরুষদের লেখাপড়া শেখানো হতে থাকে। প্রায় দুই মাস একটানা লেখাপড়া শেখানোর পর বর্তমানে প্রায় ৩৫ জন মহিলা এবং ৩২ পুরুষ সহজ ভাষায় লিখিত পত্রিকা পড়তে পারে। এভাবে অল্প দিনের মধ্যে পড়াশুনা শিখতে পেরে সকলেই খুব আনন্দিত। এ কাজটি সফলভাবে সমাপ্ত হবার পেছনে যে সকল স্বেচ্ছসেবী ভূমিকা রেখেছে তাদের মধ্যে মাহিন, ফাহিম, শুভ, মেঘনা, ম্যান্ডি, সালমা, পিয়া, সুইটি, ডলি, মাহমুদ, ফজলে রাব্বীসহ আরও বেশ কিছু ছাত্র-ছাত্রী। এরশাদনগরের একাজের সফলতা দেখে এখন কুষ্টিয়া জেলার বিভিন্ন জায়গায় আরও দশটি কেন্দ্র চালু হয়েছে।

কেন্দ্র ভিত্তিক ছাড়াও বিভিন্ এলাকায় ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গারের স্বেচ্ছাসেবকরা পারিবারিকভাবেও এ কাজটি করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে। তেমনি একটি উদ্যোগ হলো বাগেরহাট জেলার মংলা থানার খড়খড়িয়া গ্রামের আলাউদ্দিন। আলাউদ্দিন তার উদ্যোগটি বর্ণনা করে এভাবে-

গত ০৭ জুলাই, ০৮ থেকে বাগেরহাট জেলার মংলা থানার খড়খড়িয়া গ্রামের নিরক্ষরদের স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আরম্ভ করি। কিন্তু শুরুতেই বেশ কয়েকটি সমস্যার সম্মুখীন হই। যেমন: প্রথমতঃ তারা জানতে চায় এই বয়সে লেখাপড়া করে কি হবে? চাকরি পাওয়া যাবে কি? কি ধরণের চাকরি? পড়ালেখা করলে কোন টাকা পয়সা পাওয়া যাবে তো? আবার একজন বলে এইটা আবার কোন এন জি ও পড়া লেখা শেখাতে চায়? কয়েকজন বলে এই বয়সে পড়া লেখা করতে গিয়ে সময় নষ্ট করতে পারবো না, প্রভৃতি। আমি তাদের বুঝাতে চেষ্টা করি শিক্ষার কোন বয়স নাই, অশিক্ষিত মানুষ অন্ধের সমান। সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য ছোট কয়েকটি কৌশল অবলম্বন করি।

আমার সম্পর্কে চাচা নাম দাউদ শেখ, তিনি বাগদা চিংড়ির ব্যাবসা করে। কিন্তু তার পারিবারিক আয়, ব্যয় ও ব্যবসার সকল হিসাব নিকাশ আমাকে করে দিতে হতো। এই পর্যায়ে আমি তাকে বললাম আমি আপনাকে এক মাসের মধ্যে লেখাপড়া শিখিয়ে দেবো, আর হিসাব নিকাশ করার জন্য আমাকে ডাকতে হবে না। আপনার হিসাব আপনি নিজেই করতে পারবেন। কিন্তু প্রথমে তিনি রাজি হলেন না এবং বললেন এই বয়সে তার পক্ষে লেখাপড়া করা সম্ভব না। আমি তখন তাকে বললাম আপনি লেখাপড়া না শিখলে আপনার কাজ আমি করে দিতে পারবো না। তখন সে আমার প্রস্তাবে রাজি হয়ে পড়া লেখা শুরু করলো। এখন সে নিজের নাম পূর্ণ লিখতে পারে, মোটামুটি পড়তেও পারে আর ব্যবসার হিসাব নিজেই করার চেষ্টা করছে।

এই ঘটনার পর যারা পূর্বে আমার কাছ থেকে নাম স্বাক্ষর, মোবাইলের এস এম এস পড়া, নাম সেভ করা ইত্যাদি সমস্যার সমাধান করে নিতো তারাও লেখা পড়া করতে আরম্ভ করেছে। এখন ৫ জন পড়ছে। এর মধ্যে একজন সম্পূর্ণ পড়তে ও লিখতে পারে। একজনের বর্ণনা উপড়ে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই জন স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ লিখতে ও পড়তে পারে। অপর একজন অক্ষর চেনার প্রক্রিয়াধীন আছে। এখন তারা পড়ালেখার মাঝে বিশেষ মজা পাচ্ছে এবং তাদের মধ্যে একধরণের গর্ববোধ অনুভূত হচ্ছে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ও অগ্রগতি দেখে ইতিমধ্যে আরও পাঁচজন লেখাপড়া করতে আগ্রহী হয়েছে এবং আগামী মাস থেকে তারা পড়ালেখা শুরু করবে।

এধরণের উদ্যোগগুলি আমাদের মাঝে আশার সঞ্চার করে, আমাদের সাহস যোগায়। এই সকল স্বেচ্ছাসেবীরা এটাই প্রমাণ করে এ দেশের ছাত্র সমাজ এখনও নষ্ট হয়ে যায়নি, এখনও তারা পারে দায়িত্ব নিতে। তাদের দ্বারাই সম্ভব আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ ঘটানো, যা হবে নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে।

রিপোর্ট: এ কে মানিক, ফাহিম ও আলাউদ্দিন

আমরা করব জয়-৬৪

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s