দেশকে ভালবাসতে হলে দুঃসাহসিক হতে হবে – অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক

special-issue-4416

প্রচুর তরুণ-তরুণী এসেছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রাম, শহর থেকে তারা এখানে এসেছে ৷ আমার সামনে বসে আছে অনেক গুণীজন, যারা অনুষ্ঠানটিকে সফল করতে এসেছেন ৷ আমার একান্ত প্রিয়জন মোজাফফর আহমদ স্যার আছেন। আমার অত্যন্ত প্রিয়ভাজন অধ্যাপক আতিউর রহমান আছেন, চেনা-অচেনা, জানা-অজানা আরো অনেক মানুষ ৷ আমার বন্ধু আতিউর যে অর্থে তরুণ আমি কিন্তু সে অর্থে তরুণ নই ৷ বরং আমি যা দেখতে পাচ্ছি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ স্যার বাদ দিয়ে একমাত্র আমিই ৭০ ছুঁই ছুঁই যুবক বা তথাকথিত তরুণ ৷ যে কথাগুলো বলার জন্য প্রচন্ড শক্তি এবং সাহসের প্রয়োজন, আতিউর রহমানের কথার মধ্য দিয়ে যা একটু আগেই ধ্বনিত হয়েছে, আমি সে ধরনের শক্তি পাব কি-না, জানি না ৷ তবে আমি কিছু অতি সাধারণ কথাই তোমাদের সামনে বলবো ৷

আমি প্রথমেই এ সম্মেলনের আয়োজকদের অভিনন্দন জানাই ৷ অভিনন্দন জানাই এ জন্যে যে, স্রোতের বিপরীত সময়ে এতগুলো তরুণ-তরুণীকে তারা একত্র করেছে ৷ আমি জানলাম, তোমরা সকলেই নিজের ব্যয়ে এখানে এসেছ ৷ এটা সহজ কথা নয় ৷ তোমাদের বৈচিত্রময় কিছু অভিজ্ঞতার কথা শুনলাম ৷ তোমরা সবাই কোন না কোন কাজের সাথে সম্পৃক্ত এটাই সবচেয়ে আনন্দের কথা ৷ যখন কি-না অনেক তরুণের কাছে কর্ম বিমুখতাটাই উদাহরণ হয়ে উঠেছে, তখন এ সংগঠন তরুণ সমাজের কাছে কাজ নিয়ে পৌঁছুতে পারছে, এ সংগঠনের এটাই তো সবচেয়ে বড় সফলতা ৷

আমি সারা জীবন শিক্ষার সাথে যুক্ত থেকেছি ৷ মিথ্যে নয়, বহুকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছি ৷ সেই সাথে কলেজেও অধ্যাপনা করেছি দীর্ঘ নয় বছরেরও কিছু বেশী সময় ৷ আবার স্কুলেও পড়িয়েছি ৷ কাজেই সে-অর্থে আমার নিজের পড়ালেখার সময়টুকু ছাড়া বাকি সময়টা যে শিক্ষকতায় গিয়েছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই ৷ আবার কেউ কেউ আমাকে লেখক হিসেবেও বিবেচনা করে ৷ যদিও আমি জানি না, প্রকৃত লেখক কি বা কে? এ মাধ্যমগুলোর সবকটির মধ্য দিয়েই আমি গণ মানুষের কাছাকাছি থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি ৷

আমি এই দীর্ঘ সময়ে বুঝেছি, আমাদের দেশে অধিকার ও সুযোগ বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট অস্বচ্ছতা রয়েছে ৷ এ স্বচ্ছতা রয়েছে ছাত্র সমাজে, শিক্ষক সমাজে এবং অন্যত্রও ৷ শিক্ষার অধিকারকে বেশিরভাগ জায়গায় সুযোগ বলে চালিয়ে দিচ্ছে ৷ সবকিছুর আয়োজনও হচ্ছে সেরকমই ৷ এসব নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই ৷ তোমরা এসব নিয়ে ভাবো কি-না, জানি না ৷ তবে ভাবাটা জরুরী ৷ কারণ তোমাদের মধ্যেও এ অস্বচ্ছতা রয়েছে ৷ আর সুযোগের কথা বলছ, সেখানেও তোমরা বঞ্চিত ৷ কতটুকু সুযোগ পাও তোমরা? কতটুকু পাওয়া উচিত, তা কি জানো?

আমি যখন মঞ্চে আসি, তখন প্রফেসর আতিউর রহমান বলেছেন, আমি যেন তোমাদের হতাশাব্যাঞ্জক একটা কথাও না বলি ৷ আসলে আমাদের এখানে অদ্ভুত কতগুলো প্রবণতা কাজ করে ৷ হতাশা যেগুলোকে আমরা বলছি, সেগুলো আসলে হতাশা নয় ৷ এগুলো বাস্তবতা ৷ আমি চাইলেই এ বাস্তবতা এড়াতে পারি না ৷ আমরা অনেকেই আন্দাজে আমার ভাব প্রবণতায় শুধু আশাবাদ ব্যক্ত করে যাচ্ছি, বাস্তবতা গোচর না করেই ৷ আশা করছি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার, সে নিয়ে বক্তৃতা কতদিন চলছে বা চলবে? আজ আমাদের রক্তস্নাত বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে? তাই তথাকথিত আশাবাদ আমি বিশ্বাস করি না ৷

কারণ, আমি মনে করি, তথাকথিত আশাবাদ মানে অজ্ঞনতা ৷ আমি জানি না, আমাদের কোন বাঁধাগুলো অতিক্রম করতে হবে? আমাদের উচিত, সেই বাঁধাগুলোর কথা বলা ৷ সেই বাঁধাগুলোকে যদি পরাস্ত করা যায়, তাহলে তার কথা বলা হতাশা নয় ৷ কি কাজ করতে হবে আমাদের? কতটা দৃঢ়তা নিয়ে এগুতে হবে সে কাজে? কত শক্তি সঞ্চয় করতে হবে সে জন্যে? এটাই আমাদের ভাবতে হবে ৷ এগুলোকে পুঁজি করেই আমাদের এগুতে হবে ৷ জানতে হবে, আজকে ‌‌’৭১-এর স্বীকৃত খুনী, ধর্ষক কারা? এদের অনেকেই তো আজকে মন্ত্রী হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ৷ আমরা কি তাতে লজ্জিত হচ্ছি? এই সত্যটি স্বীকার করবো না, এটা কেমন করে হয়? তাহলে কি হবে বলে ‘সোনার বাংলা সকালের রোদের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠবে’ – এ বিশ্বাস লালন করে বাড়িতে গিয়ে ঘুমালে হবে?

আমি নিশ্চিন্তভাবে ঘুমাবার লোক নই ৷ তাই আমি এই অযৌক্তিক আশাবাদকে ধিক্কার দিই ৷ কাজেই আমাদের সকলের জানতে হবে এদেশে শোষণ নির্যাতন কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে? এ দেশের ১৫ কোটি মানুষ রাষ্ট্র থেকে কি পাচ্ছে? এ দেশের তরুণ সমাজকে এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে ৷ প্রতিবাদ করতে হবে ৷ আমরা শিক্ষকরা নানা রকম আর্ত চিত্‍কার করেই যাচ্ছি ৷ আমরা ‘ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’ নামে একটা দুর্বৃত্তের বলয় তৈরী করেছি ৷ এখান থেকে দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে ৷ শিক্ষা ব্যবস্থার ধারাবহিকতা এখানে নষ্ট হয়েছে ৷ এখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার মতো কোন মাথা নেই, বুদ্ধিজীবী নেই ৷ মেরুদন্ডবান বলে কেউ নেই যে বলতে পারে, আমি আমার মেধা বিক্রি করতে আপত্তি করি ৷ আমাদের এগুলোর বিরুদ্ধে সচেতন হতে হবে ৷

আমাকে গতকাল আবারও হত্যার হুমকি দিয়েছে ৷ আমার তাতে কিছুই যায় আসে না ৷ কিন্তু এটা বুঝতে হবে, দুর্বত্তায়ন কোথায় এসে পৌঁছেছে? আজ আমাকে হুমকি দিচ্ছে, কাল বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের অস্তিত্বে টান দিবে ৷ তাহলে কে প্রতিকার করবে? এটা খুব ভাল কথা যে, আমাদের আত্মশক্তিতে বলীয়ান হতে হবে ৷ কারণ আত্মশক্তিতে বলীয়ান ব্যক্তি কখনো দরিদ্র থাকতে পারে না ৷ আমি এটা শতভাগ বিশ্বাস করি ৷ কিন্তু এটা অর্জন না করা পর্যন্ত আমি এটাকে বলবো একটা মিথ্যা আশ্বাস বা শ্লোগান ৷ কারণ, এটা অর্জনের বিষয়, অনুভবের নয় ৷ এর জন্য অনেকগুলো প্রক্রিয়া প্রয়োজন ৷

যেমন, একটা বাড়িতে ১০টি ছেলে রোগে ভূগছে, খেতে পারছে না, স্কুলে যেতে পারছে না, তাহলে তাদেরকে আমরা কিভাবে আত্মশক্তিতে বলীয়ান বলবো? তোমরা যারা এখানে এসেছো, তোমাদের বাড়ির একটু পাশে তাকালেই দেখবে, বাবা বলছে, তোকে স্কুলে যেতে হবে না, ছাগলটা দ্যাখ, স্কুলে গিয়ে ঘোড়ার ডিম হবে! আমার শ্রমের মালিক আমি নই, মালিক অন্যজন ৷ তাহলে এ কথাটি শুধু শ্লোগান নয়?

আমাদের দেশে যখনই আমরা মধ্যবিত্ত হই, সাধারণ মানুষ থেকে তখনই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই ৷ আমাদের দেশে একটা কৃষকের ছেলে শহরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে ভাল চাকরী পেয়ে আর গ্রামে ফিরে যায় না ৷ কারণটা কি? কারণ আমাদের সমস্ত প্রক্রিয়া হলো বিচ্ছিন্নকরণ প্রক্রিয়া ৷ ঘাটে ঘাটে আমাদের চোরাবালি, যেখানে পা ডোবাবে সেখানে কোমড় পর্যন্ত ডুবে যাবে ৷ কাজেই প্রক্রিয়া আমাদেরকেই শুরু করতে হবে এবং কাজ আমাদের সামনে আছে ৷ এজন্য যদি দেহ থেকে আমাদের রক্ত ঝরে, তাহলে তাকে মেনে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে ৷

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আগুন লাগানো হয়েছে ৷ প্রতিটি সরকার এসে মনে করছে, তাঁর গুরু দায়িত্ব হলো, একটা শিক্ষা কমিশন তৈরী করা ৷ কেন করে তা কি তোমরা কখনো ভেবে দেখেছো? কিন্তু তোমরা কি পার না, সরকারের মাথাটা ধরে একটা ঝাঁকুনি দিতে? জানতে চেয়েছ, আগের কমিশনটার কি দোষ ছিল? কেন সেটা বাতিল করা হলো?

কাগজে দেখি আড়াই হাজার সরকারি গাড়ীর কোন হদিশ নেই ৷ এগুলো কি কারো কোন পৈত্রিক সম্পদ ছিল? কোনদিন তোমরা কি কল্পনা করেছো কি হলো এগুলোর? আমার প্রতিদিনের করের টাকায় কেনা এগুলো আমাদের সম্পদ? তাহলে আমরা যাদের সম্মানের আসনে বসাচ্ছি তাদের প্রকৃত স্থান কি? তাহলে বাস্তব অবস্থা হলো প্রায় ১৫ কোটি নুব্জ মানুষ, যাদেরকে ঠিক মানুষ বলা কঠিন, যারা সারা জীবন ধরে মানুষের স্বাদ পেল না, তাদের মূল্যায়ন কোথায়? কাজেই আমি তোমাদের বলবো, এ সকল বিষয়গুলো মাথায় রেখে নিজেকে আত্মশক্তিতে বলীয়ান বলো ৷ তুমি কোথা থেকে কিভাবে উঠে এলে তার ভিতটাকে স্মরণ রেখেই সামনে অগ্রসর হও ৷

বাংলাদেশ দরিদ্র একটা দেশ ৷ কিন্তু এদেশের মানুষ আমাদের সম্পদ ৷ আমাদের শক্তি ৷ আমি একা যে কাজটা পারবো না, সকলে মিলে সে কাজটা করা সম্ভব ৷ আমাকে অনেকে বলেন, আপনার কথাবার্তা মাঝে মাঝেই হিংস্র হয়ে যায় ৷ আমি তাদেরকে বলি ভালবাসা বেশি আছে বলেই হিংস্র হয় ৷ দেশটার জন্য আমার দরদ আছে ৷ আমার বুকের রক্তে গড়া এ দেশ ৷ কাজেই আমি বলি, ভালবাসার জন্য যদি ভাঙ্গার দরকার হয় ভাঙ্গো, কাউকে হত্যার প্রয়োজন হয তাও করো ৷ কাজেই যে কাজ তোমরা করতে এসেছো, তা করতে গিয়ে যদি কারো হাত মচকে দিতে হয় দাও ৷ হয়ত অনেকের কাছে এ কথা ধ্বংসাত্মক মনে হতে পারে৷ আসলে তা নয় ৷ এটা নির্মাণের মৌলিক কথা ৷

তোমরা যখন এ বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা কিংবা শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভাঙ্গবে তখনই তোমাদের জন্য সত্যিকার অর্থে উচ্চশিক্ষা মিলবে ৷ আমাদের অবস্থা অনেকটাই মুসলমানদের মুরগীর মতো ৷ একটু নজর পড়লেই জবাই করে খেয়ে ফেলবে ৷ কাজেই আত্মশক্তিতে বলীয়ান হবার সমস্ত শর্তগুলিই পূরণ করতে হবে ৷ অধিকারগুলো বুঝে নিতে হবে আর সেজন্যই তোমাদের সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজন আছে ৷ যে আন্দোলনে গণ মানুষের মেধা ও শ্রম ব্যয় হবে তা থেকে নতুন সম্পদ উত্‍পন্ন হতে বাধ্য

আমরা যখন স্কুলে পড়তাম, তখন আমাদের নানা রকম উপদেশ দেয়া হতো ৷ মিথ্যা বলো না, চুরি করো না, অসত্‍ পথে চলো না ইত্যাদি ৷ পরবর্তীতে আমরাও সেগুলো বলতে থাকি ৷ কিন্তু আমাদের উচিত এগুলো যেন না করতে হয় তার পথ সুগম করা ৷ সত্যিকারের শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরী হলে আমি নিশ্চিত, তোমরা কেউ নোট বই পড়বে না ৷ তোমরা আমাদের বাধ্য করো, আপনারা শিক্ষক আমাদের বাংলা ভাষার দর্শন, বিজ্ঞান ইত্যাদি মৌলিক বিষয়গুলোতে পাঠদান করেন ৷ তোমাদের দাবি করা উচিত, আন্তর্জাতিক সকল জ্ঞান বাংলা ভাষায় অনুবাদ করতে হবে

এখন আমরা নিজস্বতা বিসর্জন দিচ্ছি, বিনিময়ে পরনির্ভরশীলতা অর্জন করছি ৷ এটা ঠিক নয় ৷ ভাষা শিক্ষায় দক্ষতা যদি অর্জন করতেই হয়, তাহলে শুধু ইংরেজী কেন? একাধিক ভাষায় আমি দক্ষ হতে পারি ৷ কিন্তু নিজেরটা বাদ দিয়ে নয় ৷ আমাদের মনে রাখতে হবে, শাসকরা কখনো ভুল করে না বরং শোষিতরাই বোকা হয় ৷ যাই হোক, কথা বলতে গেলে শেষ হবে না ৷ তোমাদের এ মিলন মেলায় আসতে পেরে আমার খুব ভাল লেগেছে ৷ আমি তোমাদের সাফল্য কামনা করি।

আমরা করব জয়-৪৪

Advertisements