ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গার আমার জীবনে এক অবিস্মরণীয় পরিবর্তন এনে দিয়েছে… – মোঃ কামাল চৌধুরী

২০০৩ সালে এস.এস.সি. পাস করে আমি তখন মাহিগঞ্জ ডিগ্রী কলেজে একাদশ শ্রেণীর ছাত্র। এলাকার কিছু বখাটে ছেলের সাথে মিশে আমিও অন্যরকম হয়ে যাচ্ছিলাম। পড়াশুনা বাদ দিয়ে সারাদিন বন্ধুদের সাথে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে আড্ডা দিয়ে সময় নষ্ট করতাম। এর মাঝে কখন যে দু’বছর পেরিয়ে গেছে বুঝতেই পারি নি। ফরম ফিলাপ করে এইচ.এস.সি. পরীক্ষা দিলাম। পরীক্ষার পর রেজাল্টের অপেক্ষায় যখন বসে আছি তখনই হঠাৎ একদিন মইদুল ইসলাম বকুল ও নাজমুল ইসলাম নান্টু এসে আমাকে গণিত উৎসবের জন্য কাজ করার কথা জানালো। গণিত উৎসব কি তা আমি জানতাম না, আমার মনে কৌতুহল সৃষ্টি হলো। বিহারী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে আয়োজিত গণিত উৎসবটি সম্পর্কে বকুল ও নান্টু আমাকে ধারণা দিল। আমার কাজগুলো আমাকে বুঝিয়ে দিল। এরই মাঝে উৎসবের আগের দিন আমার পরীক্ষার রেজাল্ট বেরুলো, আমি পাস করতে পারি নি। প্রচন্ড হতাশা আর মন খারাপ থাকলেও আমি গণিত উৎসবের আয়োজনে অংশগ্রহণ করেছিলাম। এভাবেই আমি ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গার পরিবারের সাথে জড়িয়ে পড়ি।

পরীক্ষায় খারাপ করে এক সময় লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে বাড়িতে বসেছিলাম। কিন্তু যখন জানতে পারলাম ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গারের সাথে কাজ করার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো ছাত্র হতে হবে, তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আবার লেখাপড়া শুরু করব। আমি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। শুরু হলো ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গারের আদর্শে পথচলা, এরপর রংপুর হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে DHMS কোর্সে ভর্তি হলাম। এর মধ্যে ইয়ূথ ভলান্টিয়ার্স ট্রেনিং ও ইয়ূথ লিডার্স ট্রেনিং এ অংশ নেই। এভাবেই ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গার আমাকে বদলে দিল। আমি বিশ্বাস করি ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গারের নীতি ও আদর্শ একজন মানুষকে প্রকৃত মানুষ করে গড়ে তুলতে পারে।

একদিন বিকালে বাসায় বসে আছি হঠাৎ মনে চিন্তা এলো – অনেক গরীব মেধাবী শিক্ষার্থী আছে যারা বই কিনতে না পারার জন্য লেখাপড়া করতে পারছে না, তাদের জন্য কি করা যায়। মইদুল ইসলাম বকুল ও শফিকুলের সাথে পরামর্শ করে আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুরানো বই সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেই। এভাবে আমরা ৫০০ পুরাতন বই সংগ্রহ করি এবং গরীব শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করি। এরপর থেকে প্রতি বছরই আমরা পুরাতন বই সংগ্রহ ও বিতরণ করে থাকি।

ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গারের কার্যক্রমকে পুরো পীরগাছা থানায় ছড়িয়ে দেবার জন্য বিভিন্ন স্কুল-কলেজে কর্মশালা পরিচালনা করার উদ্যোগ নেই। এভাবেই আমাদের জনবল বাড়তে শুরু করে। একদিন আমার দুই সহযোদ্ধা বকুল ও শফিকুল আমাকে একটি কাগজ পড়তে দিল। তাতে লেখা – “আমি এই মর্মে অঙ্গিকার করছি যে, আমি অষ্টম শ্রেণীর একজন ছাত্রী। আমার পরিবার আমাকে জোর করে বিয়ে দিচ্ছে…।” খবরটি পড়ার পর আমরা ছুটলাম কি করে এই বিয়ে রোধ করা যায়। স্কুলে গেলাম শিক্ষকদের সাথে কথা বললাম কিন্তু তারা বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় মেয়েটির বাবা-মাকে বুঝাতে চেষ্টা করলাম কিন্তু তাতে কোন কাজ হলো না। এরপর আমরা জেলা প্রশাসকের কাছে ফোন করে বিস্তারিত জানালাম। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বিয়েটি রোধ করা সম্ভব হয়।

আরেকদিন খবর পেলাম আরেকটি বাল্যবিবাহ হতে যাচ্ছে। আমরা প্রথমেই কাজী সাহেবকে ফোন করে বিয়ে না পড়াতে অনুরোধ করলাম। তারপর বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানালাম। জেলা প্রশাসক স্থানীয় চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দিলেন। স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার, গ্রাম পুলিশের সহায়তায় বিয়েটি রোধ করা সম্ভব হয়। আলোড়ন সৃষ্টিকারী খবরটি ২৫ অক্টোবর ২০০৭, দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিতও হয়।
দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার মান উন্নয়নের জন্য আমাদের ইউনিটের উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে একটি কোচিং সেন্টার চালু করা হয়েছে। এখানে তৃতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদেরকে বিনামূল্যে পাঠদান করা হয়।

আমাদের ইটাকুমারী ইউনিটের আয়োজনে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমগুলো হলো ৫০০ বৃক্ষরোপণ, রাস্তা মেরামত, পরিত্যক্ত রাজবাড়ী সংস্কার করে দেশের ঐতিহ্য রক্ষার চেষ্টা, আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে অক্ষর জ্ঞান দান ও তাদের জীবনের দুর্ভোগগুলো সচেতন মানুষের সামনে তুলে ধরার জন্য সেমিনার। এছাড়াও এক গরীব পিতা অর্থাভাবে তার মেয়ের বিয়ে দিতে পারছিল না। অভিসারী ইউনিটের সদস্যরা তাদের ইউনিটের ফান্ড থেকে ও অন্যদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে মেয়েটির বিয়ের ব্যবস্থা করে ও বিয়ে সম্পন্ন করতে সর্বাত্মক সহায়তা করে। বাংলাদেশকে পোলিও মুক্ত করতে জাতীয় টিকা দিবসে সকল শিশুর টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে এলাকায় মাইকিং করে সকলকে সচেতন করা হয়। জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করতে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালানো হয়। আমাদের কাছে খবর আসে কোন কোন স্থানে নিবন্ধন করার জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫ টাকা করে ফি নেয়া হচ্ছে। আমরা ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গারের সদস্যরা এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। আমাদের এই আন্দোলন এখনো অব্যহত রয়েছে।

ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গার আমার জীবনে এক অবিস্মরণীয় পরিবর্তন এনে দিয়েছে। ইয়ুথের কাজে আমি যখন বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি অনেক মানুষের সাথে পরিচয়ের সুযোগ ঘটেছে। কোনদিন যাদেরকে চিনতাম না সেই সব ইয়ূথ বন্ধুদের সাথে একই আদর্শ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মনে হয়েছে কত দিনের চেনা, কত আপন। আমি জানি ছাত্রজীবন শেষ হয়ে গেলে আমি সক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারব না। তবু আমি মনে প্রাণে সবসময়ই ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গারের সাথে থাকব। সারা দেশের সকল ইয়ূথ বন্ধুদের কাছে আমার প্রত্যাশা ইয়ূথ জীবন শেষ হওয়ার পরেও আমরা যেন কেউ কাউকে ভুলে না যাই।

আমরা করব জয়, ৬৩তম সংখ্যা

Advertisements

About John Coonrod

Executive Vice President, The Hunger Project
This entry was posted in সফলতার কাহিনী. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s