আমাদের শিক্ষা আমাদের ভাবনা


ফরাসী দার্শনিক রুশো শিক্ষা সম্পর্কে বলেন, “আমাদের জন্মকালিন ত্রুটি, পূর্ণ মনুষ্যত্ব লাভে আমাদের যা কিছু প্রয়োজন, সে সব পূরণ করে শিক্ষা।” আমাদের দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে রুশোর দার্শনিক চিন্তার সাদৃশ্য খুঁজতে গেলে বৈসাদৃশ্যই বেশি পরিলক্ষিত হবে। শিক্ষা নিয়ে আমাদের দেশে এক ভয়াবহ অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ দেশ স্বাধীন হবার পর স্বাধীনতা লাভের প্রেরণায় দেশের তরুণদের একটি বিরাট অংশ বিভিন্ন স্থানে যে সকল সৃজনশীল গঠনমূলক উদ্যোগ নিয়েছিল, তরুণদের তা থেকে নিবৃত্ত করে দেশকে পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ে তরুণদের একটি বিরাট অংশকে নানারকম নেতিবাচক কাজে নামতে প্রলুব্ধ করা হয়েছে এবং তাদের নেতৃত্বের বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলশ্রুতিতে আমরা কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ অর্জন করতে পারি নি। তারপরও আমরা হতাশ নই। আশার কথা হল, ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গার-বাংলাদেশের একদল স্বেচ্ছাব্রতী ও অগ্রসর তরুণরা সামাজিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে ক্ষুধামুক্ত আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে একদল স্বেচ্ছাব্রতী তরুণ এ বছর থেকে শিক্ষা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এর একটি হল মানসম্মত শিক্ষা আন্দোলন এবং অন্যটি হল গণশিক্ষা কার্যক্রম।

গত ০১ এপ্রিল, ২০০৮ ঝিনাইদহের আদর্শ পাঠশালা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গার ঝিনাইদহ সদর ইউনিটের আয়োজনে ‘শিক্ষার মান উন্নয়ন: সম্ভাবনা, সংকট ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি জনাব মোঃ শামসুল আলমের সভাপতিত্বে সভায় আদর্শ পাঠশালা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক, বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, অভিভাবক, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতিনিধি, স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, এনজিও প্রতিনিধি ও স্থানীয় সম্মানিত ব্যক্তিত্বসহ প্রায় ৬৭ জন আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। সভায় মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে আদর্শ পাঠশালা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংকট গুরুত্ব সহকারে উঠে আসে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বলেন, “প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে সমস্ত শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয় তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ডিগ্রী পাশ (অর্থাৎ তারা এখনও ছাত্র), তাদের প্রশিক্ষণের অভাব, সকল সরকারি কাজে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্পৃক্তকরণ, ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে শিক্ষকদের সম্পর্ক, প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের ছুটি, ট্রেনিংপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ফলোআপের অভাব – এগুলোকে তিনি বিশেষ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন।

বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক বলেন, ক্লাস থ্রিতে উঠলে ভাল ছাত্র-ছাত্রীরা অন্য স্কুলে চলে যায়। যেখানে ডি সি, এসপিসহ বিভিন্ন সরকারি উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের ছেলে-মেয়েরা পড়াশুনা করে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের সম্পর্কে সাধারণের একটা ধারণা প্রচলিত আছে, তা হল শিক্ষকরা ক্লাস নেয় না, তারা চায়ের দোকানে বসে থাকে। এই ধারণাগুলো শিক্ষকদের মন ভেঙ্গে দেয়। বিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন ছাত্রী অভিভাবকদের অসচেতনতার কথা বলেন। তিনি বলেন, একজন শিক্ষক ক্লাসে সময় পান মাত্র ৩৫ মিনিট। কিন্তু শিক্ষার্থীর জন্য বাসায় চর্চা করার অনেক সময় থাকে। তাই অভিভাবকরা যদি সচেতন থাকেন তাহলে সেই সময়টার সঠিক ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। স্থানীয় একটি কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, শিক্ষকরা ইচ্ছে করলেই একটি বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারেন। শিক্ষকরা ছাত্রদের স্বপ্ন দেখাবেন এবং সেই স্বপ্ন পূরণে সহযোগী হবেন। যা আজকের দিনের শিক্ষকদের কাছে পাওয়া দুর্লভ। একজন শিক্ষক ক্লাসে যা পড়ান তা ছাত্ররা বুঝল কিনা সেটা চেক করেন না। তিনি বলেন, শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের ধারণক্ষমতা না বুঝে পাঠদান করেন, যা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার পথে অন্তরায়। শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের বিদ্যালয়ে আসার প্রতি আকৃষ্ট করতে পারেন না। একজন অভিভাবক বলেন, বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে সৃজনশীল কর্মকাণ্ড হয় না বললেই চলে। ম্যানেজিং কমিটিও সক্রিয় নয়। এরকম অনেকগুলো সংকট আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বেরিয়ে আসে। শুধু তাই নয় এ সমস্যাগুলো সমাধানে কার কী ভূমিকা আছে ও হওয়া উচিত তা নিয়েও সভায় আলোচনা হয়। শেষে সকলেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয় যে, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে।

আমরা করব জয়, ৬৩তম সংখ্যা

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s