অন্যায় বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ সপ্তাহ

1

ঝিনাইদহ সদর ইউনিট ১১ এপ্রিল ২০০৫ ‘অন্যায় বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ সপ্তাহ’ পালন করে। ‘উদ্যোগটি প্রশংসনীয়, উদ্যোগের ধরণটিও অন্য রকমের’ একথা বলেছেন অনেকেই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন জন শিক্ষক মন্তব্য করেছেন আরও একধাপ এগিয়ে। তারা বলেছেন, ‘ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গারের সদস্যরা রাজনীতি-সচেতন হয়ে উঠছে। এ উদ্যোগ অগ্রসর চিন্তার প্রতিফলন। … শুধু নিজের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে মাথা ঘামিয়েই ক্ষান্ত হয় নি তারা। চারপাশে কি হচ্ছে, কে কিভাবে অন্যায় পথে সুবিধা ভোগ করছে, তার কারণে কে বঞ্চিত হচ্ছে, তাও খেয়াল রাখা যে একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব – ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গারের সদস্যরা তারই প্রতিফলন ঘটিয়েছে। যারা মন্তব্য করেছেন তারা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গোবিন্দ চক্রবর্তী, আবু শামস ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক আবু নাসের রাজিব।

গণপ্রতিরোধ সপ্তাহের কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেয় ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গার ঝিনাইদহ ইউনিট ও পদ্মা সমাজ কল্যাণ সংস্থা যৌথভাবে। কার্যক্রম শুরু হয় ঝিনাইদহ প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে। বিশ্বায়ন কিভাবে ক্রমশই পৃথিবীকে ঝূঁকিপূর্ণ করে তুলছে প্রথমে সে সম্পর্কে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড্যাবের নির্বাহী পরিচালক সাইদুল ইসলাম, পদ্মা সমাজ কল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক হাবিবুর রহমান, সুপ্রভাত মহিলা ও শিশু উন্নয়ন সংস্থার পরিচালক ও সম্পাদিকা জেসমিন আরা, অঙ্কুর নাট্য একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন জুলিয়াস, দৈনিক গ্রামের কাগজ এর ঝিনাইদহ প্রতিনিধি আব্দুর রহমান মিল্টন এবং ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গারের ঝিনাইদহ সদর ইউনিট কোঅর্ডিনেটর কাজী মোহাম্মদ আলী পিকু।

আলোচক সাইদুল ইসলাম বলেন ‘বিশ্বায়ন আমাদের পঙ্গু করে ফেলছে। পৃথিবীর অল্প কিছু মানুষ এর দ্বারা সুবিধা ভোগ করছে। এ ব্যবস্থার বিরোধিতা না করলে একজন নাগরিক হিসেবে আমার দায়িত্বকে এড়িয়ে চলা হয়। আমি দায়িত্বহীন হতে চাই না।’

ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গারের ঝিনাইদহ সদর ইউনিট কোঅর্ডিনেটর কাজী মোহাম্মদ আলী পিকু বলে ‘বিশ্ব বাণিজ্য তথা বিশ্বায়ন সারা বিশ্বে এখন একটি আলোচিত বিষয়। সমালোচকদের মতে, অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন বিশ্বের অল্পসংখ্যক মানুষের জীবনে কেবলমাত্র সুফল বয়ে এনেছে। বিপরীতে, এই ব্যবস্থা প্রতিদিন সমাজে ভয়ানক ক্ষত সৃষ্টি করে চলেছে। সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বৃহত্তর জনগোষ্ঠির জীবনে। অথচ, এ সম্পর্কে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে অসচেতনতা। একে তো অসচেতনতা, তার উপর অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন প্রবক্তাদের রয়েছে প্রতিনিয়ত এ ব্যবস্থা সম্পর্কে ধুম্রজাল সৃষ্টির খেলা। এভাবে তাঁরা এ ব্যবস্থার বিভিন্ন কুফল বা সমাজে ভয়ানক ক্ষত সৃষ্টিকারী আসল তথ্যগুলি সকলের দৃষ্টির আড়ালে রাখার চেষ্টা করে, করছে। অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের এ সকল আড়াল করে রাখা সহজাত ত্রুটিপূর্ণ দিকগুলি সম্পর্কে স্বচ্ছ হওয়া এবং এর খোলামেলা সমালোচনা করা জরুরী হয়ে পড়েছে। … এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আমরা নিজেরা আরো সচেতন হচ্ছি।’

ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গারের সদস্য শাওন বলে ‘চারপাশে বিশ্বায়নের এ কুফল দেখার পরেও বিশ্বায়ন ব্যবস্থার দুই প্রবক্তা ইম. স্কাওয়াব ও স্মাডজা যুক্তি দেখান যে, বিশ্বায়ন ব্যাপারটি একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়া অপরিবর্তনীয়, অপ্রতিরোদ্ধ এবং এটি ইতিবাচক। তাঁরা বলেন, এর অগ্রগতিকে ঠেকানো অসম্ভব। এ প্রেক্ষাপটে তাঁরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃবৃন্দের জন্য একগাদা পরামর্শ হাজির করেছেন। তাঁরা বলেন, এই সকল নেতৃবৃন্দের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো – সকলের সামনে এটাই উপস্থাপন করা যে, বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া শুধু কর্পোরেট ম্যানেজার ও বিনিয়োগকারীদের মুনাফাই বাড়ায় না। বরং বেশিরভাগ মানুষেরও ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটায়। অধিকন্তু সাধারণ মানুষকেও এটা বোঝাতে হবে যে, অর্থনৈতিক এই নতুন পুনর্বিন্যাস আমাদের সকলের জন্য নতুন প্রাচুর্য বয়ে আনবে। … এই মিথ্যাচার মানা যায় না।

অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের পেছনে ‘ক্ষমতা’র বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথাকথিত বাণিজ্য চুক্তিসমূহ যেমন গ্যাট, নাফটা – এগুলি কেবলমাত্র কর্পোরেশনের স্বার্থকেই নিরাপদ করে। নিশ্চিত করে এইসব কর্পোরেশনের অবাধ বাণিজ্য বিচরণকে। বাস্তবিক অর্থে এই চুক্তিগুলি কর্পোরেশনগুলিকে যেকোন জবাবদিহিতার হাত থেকে রক্ষা করে, নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখে। চূড়ান্ত বিচারে এই প্রক্রিয়া এমন এক বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সংরক্ষক, যে ব্যবস্থা কেবলমাত্র উচ্চমাত্রার ‘মুনাফা‌’ অর্জন ছাড়া আর কিছু বোঝে না।’

অঙ্কুর নাট্য একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন জুলিয়াস বলেন ‘আমি একজন উজ্জীবক। একজন উজ্জীবকের দায়িত্ব হলো চারিপাশের মানুষকে ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে ধারণা দেয়া। আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি।’

আলোচনা সভার পর শুরু হয় গণস্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান। শতশত মানুষ স্বত:স্ফূর্তভাবে এতে অংশ নেয়। এর পর অনুষ্ঠিত হয় র‌্যালি। র‌্যালিতে ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গারের ঝিনাইদহ জেলার বিভিন্ন ইউনিটের শতাধিক সদস্য ছাড়াও স্থানীয় কয়েক শত মানুষ যোগ দেয়।

এ উদ্যোগের ফলে কি ফলাফল সৃষ্টি হলো জানতে চাইলে ঝিনাইদহ ইউনিটের সদস্য ও ইয়ূথ লীডার অশোক বিশ্বাস জানায় ‘আমরা সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতুহল সৃষ্টি করতে পেরেছি। অনেকেই আমাদের জিজ্ঞেস করছে, বিশ্বায়ন আমাদের কি ক্ষতি করে?’ পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে সদস্যরা জানায় ‘… মানুষের এ কৌতুহল মেটাতে আমরা ধাপে ধাপে বিশ্বায়নের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে এ ধরনের আরো উদ্যোগ গ্রহণ করব।’

আমরা করব জয়-৪৭

Advertisements