সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই – অধ্যাপক অজয় রায়

special-issue-4424

আমি একদল তরুণদের সাথে মিলিত হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি ৷ আমার সাথে তোমাদের বয়সের ব্যবধান অনেক ৷ আমি যখন তোমাদের বয়সের ছিলাম তখনকার অনুভূতি এখন হয়তো আর ফিরিয়ে আনতে পারবো না ৷ কিন্তু আমি জানি না মনটা যদি সজিব থাকে, যদি তরুণ থাকে, যদি কিছু করার উন্মেষে জাগ্রত থাকে তাহলে বয়স সেখানে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় না ৷ আমি সেই বিশ্বাসেই এই তরুণদের সাথে কিছুটা সময় কাটাতে এসেছি ৷

আমি যে তোমাদের সম্পর্কে খুব বেশি জানি তা নয় ৷ বলা যায় জানতে শুরু করেছি ৷ তোমরা যখন আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছ তখন তোমাদের সংগঠনের লক্ষ্য এবং আগামী বছর কি অর্জন করতে চাও তা জানিয়েছ ৷ তাতে আমার মনে হয়েছে, তোমরা যা অর্জন করতে চাও তা বর্তমান বাস্তবতায় খুব দুরহ কিন্তু অর্জনযোগ্য ৷ কারণ বর্তমান বাংলাদেশে চারদিকে ক্ষুধা আছে ৷ রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক লক্ষ্যহীনতা আছে সেজন্যই এগুলো দুরুহ ৷

তারপরও তোমরা যে দৃপ্ত অঙ্গীকারে এগুলো অর্জনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছ, সেজন্য মোবারকবাদ জানাই ৷ প্রতিজ্ঞা, প্রত্যাশা আর মনোবল যদি থাকে তাহলে এ বাঁধা গুলো দূর করা যায় ৷ এ প্রসঙ্গে আমি প্রথমে আমার দেশ সংস্কৃতি ও মানুষের কথা বলতে চাই ৷ আমাদের দেশে নানা জাতির, নানা ধর্মের, নানা বর্ণের মানুষ আছে ৷ আমাদের ভাষা প্রায় একই, বাংলা ভাষা ৷ আমাদের সংস্কৃতির নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে ৷

আমাদের পশ্চাতেও রয়েছে এক বিরাট ইতিহাস ৷ সে ইতিহাস আমাদের বুঝতে হবে ৷ সে ইতিহাস থেকে উঠে আসা যে সংস্কৃতি আমরা লালন করছি, যে কৃষ্টির চর্চা করছি, সেগুলোকে আত্মস্থ করতে হবে ৷ আমাদের ভাষা আমাদের পরম সম্পদ ৷ আমাদের সাহিত্য আমাদের পরম সম্পদ। এ ভাষাকে আরো উদ্দিপ্ত করতে হবে ৷ তাহলে বিশ্ব সভায় স্থান করে নেয়া সহজ হবে ৷ বিচিত্র মানুয়ের দেশ আমাদের এ দেশ ৷ কিন্তু আমরা এই বিচিত্র মানুষগুলোকে চিনতে পারিনি। বুঝতে চেষ্টা করিনি। আমাদের পাশের আদিবাসী মানুষগুলোকে একত্র করতে হবে ৷

তারা যেন গর্বের সাথে কথা বলতে পারে বাংলা আমার দেশ আমার ভাষা ৷ তাদের ভাষা, বসতি এবং সংস্কৃতির উপর আমরা অত্যাচার করেছি ৷ এক কথার এই মানুষগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে ৷ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ৷ আমরা যারা বাঙ্গালী বলি নিজেদেরকে, তারা এই পিছিয়ে পড়া মানুষদের মধ্য থেকেই উঠে এসেছি ৷ আমাদের মধ্যে দ্রাবিড় আছে, অস্ট্রিক আছে, আর্য আছে, অনার্য আছে অথচ আমরা সেই শংকর জাতি হয়েও আমাদের পাশের জাতিগুলোকে ঘৃণা করি ৷ আমার খুব খারাপ লাগে যখন দেখি স্কুলের ছেলেমেয়েদের পাঠ্য সমাজ বিজ্ঞান বইতে এই আদিবাসীদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় অত্যন্ত ঘৃণার সাথে ৷

special-issue-4426

বইয়ের একটি ছবিতে দেখানো হয়েছে একজন আদিবাসি একটি শুকুর শিকার করে ঘাড়ে করে বয়ে নিচ্ছে ৷ ছবির নীচে ক্যাপশন দেয়া হয়েছে বাংলাদেশের উপজাতি ৷ আসলেই কি তারা উপজাতি? এ সত্যটুকু আমাদের জানতে হবে, বুঝতে হবে ৷ আমাদের মূল নিহিত রয়েছে ওদের মধ্যে ৷ বাংলাদেশের লোককবিরা বাব বার এ কথাটিই বলতে চেয়েছেন ৷ গরুর চামড়ার রং ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে কিন্তু দুধ একই রকম সাদা ৷ কাজেই ভিন্ন ভিন্ন রকম মানুষ হতে পারে কিন্তু তার মায়ের দুধ কিন্তু একই রকম সাদা। এ দর্শনগুলো আমাদের আত্মস্থ করতে হবে ৷ এর ভিত্তিতেই জীবন চর্চা করতে হবে ৷ তার মধ্যে থাকতে হবে আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিজ্ঞান সবকিছুই ৷

শিক্ষা নিয়ে তরুণদের মুখোমুখি হতে হয় ৷ তাদের অভিভাবকের মূখোমূখি হওয়া দরকার ৷ আজকে আমরা বলি নানা রকমের সমস্যায় জর্জরিত শিক্ষা ব্যবস্থা ৷ কারণ বর্তমানে যে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত তা আমরা পেয়েছি উত্তরাধিকার সূত্রে ৷ সেই কাঠমোকেই কখনো মেরামত করে আবার কখনো মেরামতের নামে আরো খারাপ করছি ৷ এই শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের অনুপ্রাণিত করে না ৷ আমরা প্রতিনিয়ত অভিযোগ করি, আমাদের শিক্ষার মান খারাপ হচ্ছে, অভিযোগ শিক্ষকরা করেন, ছাত্ররা করেন, অভিভাবকরা করেন, আর রাজনীতিবিদরা তো করেনই ৷

আমরা জানি না, শিক্ষার লক্ষ্য কি? উদ্দেশ্য কি? কি এর দর্শন? যার ফলে দেশ প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিতদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ৷ আমরা সেজন্যই চাইবো তরুণদের কাছ থেকে একটি বিকল্প শিক্ষা দর্শন তৈরী হোক ৷ ছাত্র-শিক্ষক অভিভাবক সম্মিলিতভাবেও হতে পারে ৷ কিন্তু এর মূল লক্ষ্য হবে একটাই ৷ মানুষে মানুষে বিভেদ কমানো ৷ এর পিছনে দর্শন একটাই “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই”

যে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে একটি লোকায়ত শিক্ষা ব্যবস্থা এবং লোকায়িত মানুষ গড়ে উঠবে ৷ যারা দেশের প্রতি, ইতিহসের প্রতি, সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে ৷ বিশ্ব মানবতাবাদ এর মধ্যদিয়ে উদ্বুদ্ধ হবে ৷ আমি এই প্রত্যাশাই করি ৷ তোমরা এ কাজে নেতৃত্ব দিবে ৷ তোমাদের সকলকে ধন্যবাদ ৷

আমরা করব জয়-৪৪

Advertisements