একটি অভিন্ন গণমূখী শিক্ষা নীতি প্রণয়নে তোমরাই হতে পার অগ্রনায়ক – ড. বদিউল আলম মজুমদার

special-issue-4427

দূর দূরান্ত থেকে নিজ খরচে এ মিলনমেলায় অংশগ্রহণের জন্য তোমাদের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই ৷ আমি উজ্জীবক পূণর্মিলনীতে একটি কথা বলেছিলাম: আমরা যখন একত্রিত হই তখন এটা শুধু আর মিলনমেলা থাকে না ৷ এটা ভালবাসার মেলায় পরিণত হয় ৷ আমরা একে অপরকে ভালবাসি, এদেশকে ভালবাসি, এদেশের মাটিকে ভালবাসি ৷ সে ভালবাসার সেতু বন্ধনে আবদ্ধ হয়েই আমরা একত্রিত হয়েছি ৷ সে ভালবাসার ভিত্তিতেই আমরা কাজ করি ৷ ভালবাসার কারণেই বাংলাদেশের জন্য আত্মমর্যাদাশীল ভবিষ্যত্‍ সৃষ্টি করতে প্রত্যয়ী ৷

তোমরা জান, কয়েকদিন আগে আমাদের দেশে একজন বিখ্যাত মানুষ এসেছিলেন ৷ ড. মাহাথির মোহাম্মদ ৷ তাঁকে নিয়ে পত্রপত্রিকায় অনেক হৈ চৈ হয়েছে, টেলিভিশনে অনেক ছবি দেখানো হয়েছে এবং তাঁর কথা আমরা আরো অনেকেই শুনেছি ও পড়েছি ৷ এই ব্যক্তি কেন বিখ্যাত? তিনি আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি ৷ তাঁর প্রজ্ঞাবান ও গতিশীল নেতৃত্বের ফসল আজকের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ৷

আমার মনে আছে ষাটের দশকের শেষ দিকে আমরা অনেক ছাত্র-ছাত্রী পড়িয়েছি যারা মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং দক্ষিণ-দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছে ৷ তার মানে কি? ষাটের দশকে, সত্তুরের দশকে আমরা মালয়েশিয়ার থেকে অনেকখানি অগ্রসর ছিলাম ৷ অন্তত শিক্ষার দিক থেকে ৷

আমি এক সময় একটা গবেষণা করেছিলাম ৷ তাতে দেখেছি সত্তুরের দশকের প্রথম দিকে অর্থনীতিক দিক থেকে দক্ষিণ কোরিয়া এবং বাংলাদেশের প্রায় একই অবস্থানে ছিল ৷ উভয় দেশেরই মাথঅপিছু আয় ছিল প্রায় ১০০ মার্কিন ডলার ৷ আজকে দক্ষিণ কোরিয়া অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে ৷ তোমরা নিশ্চয়ই জান আজ তাদের অবস্থান কোথায় ৷ গত ৩৩ বছরে দক্ষিণ কোরিয়ার আয় বেড়েছে ১০০ গুণের বেশী ৷ আর আমাদের বেড়েছে মাত্র সাড়ে চার গুণ ৷ আমরা কি চাই না সে সকল দেশের মতো আমাদের অবস্থান হোক? নিশ্চয়ই চাই ৷

আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বেশী ভাল নয় ৷ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কর্মের সুযোগ আজ হুমকীর সম্মুখীন ৷ কিন্তু এ রকম পরিস্থিতি কেন তৈরী হলো? তার হয়তো অনেক কারণ আছে ৷ তবে এর অন্যতম একটি কারণ হলো সঠিক নেতৃত্বের অভাব ৷ যথার্থ প্রগতিশীল নেতৃত্বের অভাব ৷ আজ আমাদের দেশে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত নেতৃত্ব খুঁজে পাওয়া মুশকিল ৷

যারা দেশকে ভালবাসে, তারা দেশের মানুষকে ভালবাসে ৷ জনগণের সত্যিকারের উন্নয়নের জন্য তারা নিবেদিতভাবে কাজ করে ৷ নিজের উন্নয়ন বা গোষ্ঠী স্বার্থে নয় ৷ আমরা যদি মালয়েশিয়ার দিকে তাকাই, অন্যান্য উন্নত দেশের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব তাদের সব কিছুই সম্ভব হয়েছে সঠিক নেতৃত্বের কারণে ৷ বাংলাদেশের ব্যাপক সন্ত্রাস, ব্যাপক দূর্নীতি, দূর্বৃত্তায়ন, রাজনৈতিক অস্থিরতা সব কিছুর পিছনে রয়েছে সৎ, যোগ্য ও নিবেদিত নেতৃত্বের অভাব ৷

তাহলে আমাদের কি করতে হবে? অবশ্যই এক ঝাঁক যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে হবে ৷ এই নেতৃত্ব আসবে কোথা থেকে? অবশ্যই আমাদের নিজেদের মধ্য থেকে ৷ আমাদের গ্রাম গঞ্জ থেকে ৷ তোমরাই সেই সম্ভাব্য নেতৃত্ব ৷ ইয়ূথ এন্ডিং হাঙ্গার-বাংলাদেশ তোমাদের নেতৃত্বের সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটানোর চেষ্টা করছে ৷ তোমাদের সত্‍ যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করছে ৷ তোমাদের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতাবোধ তৈরীর চেষ্টা করছে ৷

আমাদের জননী আজ রুগ্ন, অনেক সমস্যায় জর্জরিত ৷ এই জননীকে যদি সুস্থ্য করতে হয় তাহলে কাকে দায়িত্ব নিতে হবে? অবশ্যই আমাদের নিজেদের যা কিছু আছে তা নিয়েই এগিয়ে আসতে হবে ৷ তোমরা এখন ছাত্র-ছাত্রী কিন্তু ভবিষ্যতে তোমাদেরকেই নেতৃত্বের গুরু দায়িত্ব নিতে হবে ৷ মানুষের উন্নয়নে তোমাদের অবদান রাখার সুযোগ আরো অনুপ্রাণিত এবং সংগঠিত হবে ৷ নতুন কর্ম উদ্দীপনা নিয়ে নতুন প্রত্যয়ে আরো বলিষ্ঠ হবে ৷

আমাদের দেশে নীতিনির্ধারকরা তাদের স্বার্থপর জনকল্যাণ বিমূখ কাজের মাধ্যমে গ্রামীণ তৃণমূল পর্যায়ের জনগোষ্ঠীর সাথে অনেক বিশ্বাসঘাতকতা করছে ৷ বিশেষত: তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে গ্রামীণ শিক্ষার মানে ধ্বস নামিয়ে ৷ যার পরিনাম অত্যন্ত ভয়াবহ ৷ শিক্ষায় ধ্বস নামার ফলে আমাদের কোটি কোটি ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যত্‍ নষ্ট হচ্ছে ৷ তাদের বিকাশের পথ রুদ্ধ হচ্ছে ৷ তাদের পরিবারের ভবিষ্যত্‍ অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে ৷ এর জন্য নীতিনির্ধারকদের নীতির সমস্যা যেমন ক্ষতির কারণ হয়েছে তেমনি অভিভাবকদের অনিহাও বিরাট ভূমিকা রেখেছে ৷

কিন্তু এ অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না ৷ আমাদের অগ্রসর হতে হবে প্রগতি ও কল্যাণের পথে ৷ তোমাদের মতো স্বেচ্ছাব্রতী তরুণদেরই এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পার ৷ অতীতের মতো তোমরাই পার, একটি কাঙ্ক্ষিত, ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে ৷ সমাজের সকল স্তরের মানুষেরা যাতে শিক্ষার অধিকার পায় সেই লক্ষ্যে সকলকে বিশেষত: ছাত্র-ছাত্রীদের সংগঠিত ও সোচ্চার করতে পার ৷ বর্তমান শিক্ষা কমিশন যে অসঙ্গত ও অনোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থার সুপারিশ করেছে সে রকম শিক্ষা ব্যবস্থা নয় ৷ একটি অভিন্ন প্রগতিশীল শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের খুব প্রয়োজন ৷ তোমরাই পার এ জন্য কাজ শুরু করতে ৷

তাই এখনই আমাদের ভাবা দরকার কিভাবে তৃণমূল পর্যায় থেকে একটি শিক্ষা আন্দোলন গড়ে তোলা যায় ৷ এ বিষয়ে অনেকে আছেন যারা সার্বিক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত ৷ তারা তোমাদের সাথে নিবিষ্টভাবে কাজ করতে আগ্রহী ৷ আমি আশা করি, তোমরা এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কর্ম পরিকল্পনা তৈরী করবে ৷ যার ভিত্তিতে এটি সত্যিকারের আন্দোলন দানা বেঁধে উঠবে রূপ নেবে ৷

আজ তোমাদের সামনে থাকছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ ৷ একটি নতুন সমাজ বিনির্মাণের চ্যালেঞ্জ ৷ কাজেই তোমাদেরকে হতে হবে সেই আলোর কণা, যা থেকে লক্ষ প্রদ্বীপ জ্বলবে ৷ তোমরা মানুষ হলে লক্ষ মানুষ মানুষ হবে ৷ কবি বলেছেন –

“কে জাগিবে আজ, / কে করিবে কাজ, / কে ঘোচাবে জননীর লাজ?” তোমাদের জন্য এই চ্যালেঞ্জ রইল ৷ আমি নেতৃত্বের জন্য মোবারকবাদ জানাই

আমরা করব জয়-৪৪

Advertisements