উৎসের অনুসন্ধান করতে হবে – ড. আতিউর রহমান

special-issue-4420

প্রথমেই আমি তোমাদের অভিনন্দন জানাতে চাই ৷ এই মুহুর্তে তোমরা তালির মাধ্যমে যে প্রত্যাশা তৈরী করলে, সে জন্যে অসংখ্য ধন্যবাদ তোমাদের ৷ আমি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবো কি-না জানি না ৷ আমি একটু সুযোগ পেলেই তোমাদের কাছে চলে আসি এটা তোমরা জানো ৷ এর আগেও তোমরা যে কয়েকবার ডেকেছো আমি সঙ্গে সঙ্গে এসেছি ৷ সারাটা দেশ যেভাবে হতাশায় ডুবে যাচেছ তোমাদের কাছে এলে তা থেকে পরিত্রাণ পাওযা যায় ৷ আমি নিজেও খানিকটা সাহস পাই এই ভেবে যে, না, সবকিছু হারিয়ে যাচ্ছে না ৷ হতাশা সবকিছু গ্রাস করছে না ৷ এখনো কিছ ফাঁক-ফোকর আছে ৷ যেখান দিয়ে আমরা হয়তো বেড়িয়ে যেতে পারবো ৷

পরশুদিন হাসান ভাই এর সাথে মন্ত্রণালয়ের একটা মিটিং-এ ছিলাম ৷ সেখান থেকে বেড়িয়ে খুব খারাপ লগেছে ৷ কারণ, তার আগের দিন সারাদিন তাকে বিরক্ত করেছে সাম্প্রদায়িক শক্তির মানুষ, রাজশাহীতে যাদের প্রচন্ড দাপট ৷ আমরা জানি, তাকে সারাক্ষণ মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হচ্ছে ৷ সেই অবস্থায় তিনি আমাদের সাথে কথা বলছেন ৷ আমরা হাসান ভাইকে সবাই বলেছি, আমরা আছি আপনার পাশে ৷ হতাশ হলে চলবে না ৷ আমরা হতাশ, কারণ আমরা ছাড়া ছাড়া ৷ কিন্তু যখনই আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি, হতাশা কেটে গেছে ৷

আমি এখানে এসে জেনেছি, তোমরা একটি প্রত্যাশার ভিত্তিতে এখানে একত্রিত হয়েছো। রবীন্দ্রনাথ দিয়েই শুরু করি ৷ তাঁর কথা আমি সুযোগ পেলেই বলি ৷ তিনি একটা কথা বলেছেন, পাত্রের আকার যতটা, ঠিক ততটাই জল ধরবে ৷ আমার গ্লাসটা যদি অনেক বড় না হয়, সেখানে অনেক বেশী জল তুমি রাখতে পারবে না ৷ একটি জাতিরও সেরকম একটি ম্বপ্ন দরকার ৷ প্রত্যাশার একটা আধার দরকার ৷ সে আধার যত বেশি বড় হবে, তত বেশি সুযোগ হবে প্রত্যাশা অর্জনের ৷

তোমরা যে কাজটা করছো, তা হলো বিনে পয়সায় জাতির স্বপ্নকে সম্প্রসারিত করছো ৷ প্রতিদিন সকালে যখন সংবাদপত্র খুলি, মনে হয় না আমরা কোন স্বাধীন দেশে বাস করছি ৷ আসলে অধিকার নিশ্চিত করার যে রাষ্ট্র তা তো খুঁজে পাওয়া ভার ৷ সারাক্ষণ আমরা কেবল দারিদ্র্যের কথা বলি, কি পাই নি তার হিসেব করি। আমাদের ব্যর্থতার কথা বলি, আমাদের পরাজয়ের কথা ভাবি ৷ অথচ, একটি ডিসেম্বর মাস পার হলেই নতুন আরো একটি বছর ৷ তোমাদের এখানে এসে দেখছি তোমরা অন্তত পরাজয়ের কথা বলছো না ৷
special-issue-44212
তাই এ সময়ে আমি তোমাদের অনুরোধ করবো, তোমরা একটু উৎসের সন্ধান করো ৷ আমরা কারা? কোথা থেকে এসেছি? কি আমাদের পরিচয়? কিভাবে আমরা এ দেশটাকে পেলাম? একটি স্বাধীন বাংলাদেশ ৷ কাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এ দেশ? এসব একটু জানার চেষ্টা করো ৷ কারণ, ভিতের সন্ধান করা বড় জরুরী ৷

এ বছর প্রথম আলোর বিবেচনায় শ্রেষ্ঠ বই শাহিন আক্তারের “তালাশ” নির্বাচিত হয়েছে ৷ বইটিতে তিনি আমাদের এই ভিতের কথাই বলেছেন ৷ তিনি এখানে আমাদের সংগ্রামের ইতিহাসকে তুলে ধরেছেন ৷ একটা পৈশাচিক সময়ের বিরুদ্ধে সাহসী মানুষের সাহসী সংগ্রামের কাহিনী ৷ আমি তোমাদের প্রত্যেকে অনুরোধ করবো এ সংগ্রামের ইতিহাস তালাশের জন্য ৷

তোমাদের কর্মশালায় তোমরা সামাজিক ঋণ শোধের কথা বলো ৷ আর আমরা অর্থনীতির ভাষায় বলি প্রতিটি মানুষ কোন না কোনভাবে সরকারকে কর প্রদান করে ৷ এই যে তোমরা বসে আছো, যখন বাজারে যাও, কোন একটা জিনিস ক্রয় করো, তখনই সেগুলোর মধ্য দিয়ে একটা নির্দিষ্ট পরিমান টাকা সরকারের ঘরে চলে যায় ৷

ড. বদিউল আলম মজুমদার হিসেব করেছিলেন, একটি ইউনিয়ন থেকে আমরা প্রতি বছর অন্তত এক কোটি টাকা পরোক্ষ কর দিই ৷ কিন্তু তার বিনিময়ে আমরা ১৫-২০% ও ফেরত পাই না ৷ পুরোটাই চলে যায কেন্দ্রের ঘরে, একদল লোকের হাতে ৷ যারা প্রতি বছর কাগজে কলমে ২২,০০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প করেন ৷ অথচ প্রকৃত চিত্র ভিন্ন ৷ একরাতের মধ্যেই তাদের বিএমডব্লিউ স্টক শেষ হয়ে যায় ৷ অথচ ঐ রাতেই লক্ষ লক্ষ মানুষ ফুটপাথে শুয়ে থাকে ৷

আজকের এই রাতে ঢাকায় যাও, দেখবে কি প্রচন্ড শীতের মধ্যে মানুষ রাস্তায় ঘুমুচ্ছে ৷ কাজেই, রাতের আঁধারেই যে বরাদ্দের শেষ হয়ে যায়, সেগুলোর কারণ অনুসন্ধান করতে হবে ৷ কোথায় যায় এগুলো? কাদের পেটে? বাংলাদেশের হৃদয় ধরে টান দিচ্ছে যারা, সেই শকুন কারা তা আমাদের জানতে হবে ৷

যুদ্ধের সময়কার একটা কথা মনে পড়ছে ৷ একদিন সন্ধ্যে বেলায় মুক্তিযোদ্ধারা একটি গলি দিয়ে যাচ্ছে ৷ সে সময় রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসে ছিল দোকানদাররা ৷ তারা বললেন, আপনারা অন্য রাস্তা দিয়ে যান ৷ এ দিকে রাজাকার আলবদররা আছে ৷ আমরা ভুলে গেছি সেই সকল মুক্তিযোদ্ধা দোকানদারদের কথা ৷ আমরা ভুলে গেছি আমাদের সেইসব বোনদের কথা, যারা সেদিন ভাইদের আগলে রেখেছে তাদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ৷ সেদিন বোনেরা আমাদের দেখে কোন ভয় পায় নি ৷ কিন্তু আজকে কেন এমন হলো আমার প্রত্যাশিত বাংলাদেশের ৷ কোথায় গেল সাহসী মুক্তিযোদ্ধারা! আজকে সন্ধ্যে বেলা মা বোনেরা ঘর থেকে বেরোতে ভয় পায় ৷ কাদের ভয় পায়?

special-issue-44221

এ কথা ঠিক যে, আজকে আমরা অর্থনৈতিকভাবে খানিকটা ভাল আছি ৷ তারপরেও তোমরা জেনে দু:খ পাবে যে, এ বছর আমাদের খাদ্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে প্রায় ৭-৮ লক্ষ টন ৷ এবং যার কারণে চালের দাম আর কমছে না ৷ এক কেজি চালের দাম ১৮-২৩ টাকা ৷ সেই মানুষের কথা তোমরা ভাবো ৷ তাদের কথা আমাদের বলতে হবে, যাদের কন্ঠস্বর অত্যন্ত নীচু ৷

আমি খুব খুশী হয়েছি জেনে, তোমরা শিক্ষা আন্দোলনে যোগ দিয়েছো ৷ বাংলাদেশে ঝড় নয় বন্যা নয় বড় বিপর্যয় ঘটে গেছে শিক্ষা ব্যবস্থায় ৷ নেহেরু বলেছিলেন, ভারত আজ থেকে বিশ, ত্রিশ, পঞ্চাশ বছর পর কেমন ভারত হবে তা নির্ধারণ হয়ে গেছে আজকের শ্রেণী কক্ষে ৷ আর আমরা আমাদের ক্লাস রুমে কি করছি তা জানি না ৷ কাজেই আমাদের সকলের দায়িত্ব শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে ঠিক করা ৷ অভিভাবকরা শিক্ষকদের জিজ্ঞাসা করবেন, আজকে ক্লাসে কি পড়ালেন? সন্তানদেরকেও তাদের কর্তব্য পালনে উত্‍সাহিত করবেন ৷ এভাবে শিক্ষাকে বাঁচাতে হবে ৷

আজকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা কুরুক্ষেত্র ৷ গ্রাম গঞ্জে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক করা হচ্ছে ৷ টাকার বিনিময়ে নিম্ন মানের শিক্ষকদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে ৷ এই হলো আমাদের শিক্ষার বর্তমান হাল হকিকত। কাজেই তোমাদের নিজেদের গড়ে তোলার দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে ৷ যে আন্দোলনে তোমরা যুক্ত হয়েছো, এর উপর নির্ভর করছে অনেক কিছু ৷ আমরা বড় আশা নিয়ে তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছি ৷ তোমাদের অভিবাদন ৷ তোমরা সফল হও এ প্রত্যাশা ৷


আমরা করব জয়-৪৪


Advertisements